নারায়ণগঞ্জে চুরি, ছিনতাই ও বিভিন্ন অপরাধকে কেন্দ্র করে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। তবে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এখন উদ্বেগজনক এক প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে বিচার কিংবা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে আইনের শাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে সিজান (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচারের বিষয়টি। পরিবারের দাবি, তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে। আর অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাকে শুধুমাত্র বোঝানোর জন্য ডাকা হয়েছিল।
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (৪ জুলাই) রাতে। নিহত সিজান পশ্চিম মাসদাইর এলাকার ইউনুছ ওরফে ইন্নু মিয়ার ছেলে।
নিহতের বাবা ইন্নু মিয়ার অভিযোগ, এলাকার একটি সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা সিজানকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে মাসদাইর মোড়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি দাবি করেন, মারধরের সময় তার ছেলের পায়ে গুরুতর আঘাত করা হয় এবং দীর্ঘ সময় নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় মসজিদের ইমাম কাউসার বলেন, সিজানের বিরুদ্ধে এলাকায় ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তাকে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বোঝানোর জন্য আনা হয়েছিল। তবে পরে কিছু উত্তেজিত ব্যক্তি তাকে মারধর করে। যারা মারধরে অংশ নিয়েছে, তারা তার নির্দেশে কাজ করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে জনতাকে সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাতে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলতে শোনা যায়। ভিডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ক্ষুব্ধ। তবে সেই ক্ষোভ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালত ও রাষ্ট্রের। গণপিটুনি বা মবের মাধ্যমে বিচার করতে গেলে নিরপরাধ মানুষও শিকার হতে পারেন। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, “মব সন্ত্রাস কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।

আপনার মতামত লিখুন :