ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

হকার নিয়ে স্ট্যান্ডবাজি!

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬

হকার নিয়ে স্ট্যান্ডবাজি!

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও প্রধান সড়ক হকারমুক্ত করার ঘোষণা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি। সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে জোরালোভাবে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। তখন নগরবাসীর মধ্যে আশা জেগেছিল, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বর্তমানে শহরের চাষাঢ়া, ২ নম্বর রেলগেট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, কালীরবাজার, নিতাইগঞ্জ, ডিআইটি, নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আগের মতোই হকারদের দখলে রয়েছে ফুটপাত। কোথাও কোথাও ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের একাধিক লেন পর্যন্ত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। ফলে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযান এখন অনেকটাই ‘আই ওয়াশ’ বা লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। অভিযান চলাকালে কয়েক ঘণ্টার জন্য হকারদের সরিয়ে দেওয়া হলেও প্রশাসনের গাড়ি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার আগের জায়গায় দোকান বসে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান শেষ হতে এক ঘণ্টাও লাগে না, এর মধ্যেই ফুটপাত আবার পূর্ণ হয়ে যায়।
গত ১৩ এপ্রিল অভিযান শুরুর সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে এবং অবৈধ দখল কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। কিন্তু বাস্তবে সেই ঘোষণার প্রতিফলন মিলছে না। বরং দিন যত যাচ্ছে, ততই হকারদের দখল আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শহরের ব্যবসায়ীদেরও অভিযোগ রয়েছে, বৈধভাবে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলেও অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা হকারদের কারণে তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ফুটপাতের দোকানে কম দামে পণ্য বিক্রি হওয়ায় ক্রেতাদের একটি বড় অংশ সেখানে ভিড় করছেন। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে যানজটও দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চাষাঢ়া, ২ নম্বর রেলগেট ও বঙ্গবন্ধু সড়কে হকারদের কারণে যানবাহনের গতি প্রায় থেমে যায়। রিকশা, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন একই সরু জায়গা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। এতে অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি উচ্ছেদ অভিযান সফল হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিদিন একই জায়গায় কীভাবে হকাররা আবার বসে পড়ছেন? প্রশাসনের নজরদারির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, নাকি কোনো অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এদিকে কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প স্থান খোঁজার কথাও জানিয়েছেন। তিনি শহরের রেললাইনের একপাশে সম্ভাব্য পুনর্বাসন এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে সেই উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে পুনর্বাসনও হয়নি, আবার ফুটপাতও দখলমুক্ত হয়নি।
শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একদিকে হকারদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কোনো ধরনের আপস বা ছাড় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবারের মতো এবারের অভিযানও কেবল ঘোষণা ও প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, হকার সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এটি একদিনে সমাধান করাও সম্ভব নয়। আমরা উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছি। হকারদের জন্য উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ করলে তারা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসবে। এজন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে। পুনর্বাসনের পর নগরবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না।

Link copied!