নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম দেওভোগে তিনতলা ভবনের দেয়াল ধসে ৭ মাসের শিশু আরিয়ান নিহতের ঘটনাটি নানা প্রলোভন ও প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। সন্তানহারা অসহায় পিতা মো. জসিম মিয়া অভিযোগ করেছেন, ঘটনার পর মামলা করতে চাইলে বাড়ির বাড়িওয়ালা ও বিএনপি নেতা সরকার আলম তাকে মামলা না করতে নানাভাবে চাপ ও প্রলোভন দেখান। এমনকি পরবর্তীতে মামলা করলে কোনো লাভ হবে না এবং কোনো আইনজীবী তার মামলা পরিচালনা করবে না বলেও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছিল কোরবানির ঈদের আগের দিন অর্থ্যাৎ গত ২৭ মে বুধবার সকালে বৃষ্টির তোড়ে দেওভোগের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম দেওভোগ এলাকায় লন্ডন প্রবাসী সরকার কামালের মালিকানাধীন একটি তিনতলা ভবনের ছাদের সাইড-ওয়াল ধসে পাশের টিনশেড ঘরের ওপর পড়ে। এতে ওই ঘরে ঘুমিয়ে থাকা রেস্তোরাঁ কর্মী জসিমের ৭ মাসের অবুঝ শিশু আরিয়ান নিহত হয় এবং তার স্ত্রী খাদিজা বেগম গুরুতর আহত হন।
সম্প্রতি নিহত শিশুর বাবা জসিম মিয়া ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা ও পরবর্তী হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন। জসিম জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কাজের জন্য বাড়ির বাইরে ছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত এসে স্ত্রী ও সন্তানকে উদ্ধার করে প্রথমে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেন। সেখান থেকে চিকিৎসকরা মাতুয়াইল শিশু হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার্ড করেন। ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা শিশু আরিয়ানকে মৃত ঘোষণা করেন। এই দুর্ঘটনায় জসিমের স্ত্রী খাদিজার মাথায় ২২টি সেলাই পড়ে এবং কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানের হাড় ভেঙে যায়।
জসিম মিয়া অভিযোগ করেন, আমি তখন সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাড়িওয়ালা ও বিএনপি নেতা সরকার আলম আমাকে মামলা করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন—মামলা করে আর কী হবে, যে চলে গেছে সে তো আর ফিরবে না। তার চেয়ে যে বেঁচে আছে তার চিকিৎসার জন্য ১৫/২০ লাখ টাকা দেওয়া হবে এবং আমরা যে টিনশেড ঘরে থাকতাম, সেখানে একটি রুম আমাদের নামে লিখে দেওয়া হবে। স্ত্রীর মুমূর্ষু অবস্থার কারণে ও চিকিৎসার দিকে তাকিয়ে আমি তখন মামলা করিনি।
জসিম আরও জানান, ঘটনার পর আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তাকে বিভিন্ন দফায় ৭০ হাজার টাকার মতো দেওয়া হয়। বর্তমানে তার স্ত্রী চিবিয়ে কোনো খাবার খেতে পারেন না, তাকে লিকুইড খাবার খাওয়াতে হয়, তার স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসার দরকার বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। এখন বিচারের নামে খালি স্ট্যাম্প এনে তাকে সই দিতে বলা হচ্ছে। জসিম খালি স্ট্যাম্পে সই দিতে অস্বীকৃতি জানালে লোকমারফতে তাকে ২ লাখ টাকা নিয়ে রফা করার কথা বলা হয়।
জসিমের অভিযোগ, তারা প্রভাবশালী হওয়ায় আমাকে বলছে—মামলা করলে কোনো লাভ হবে না। সব আইনজীবী আমাদের কথায় চলে, তোর মামলা কেউ নিবে না, কেউ পরিচালনা করবে না। জসিম উল্লেখ করেন, বাড়িওয়ালা সরকার আলমের আরেক ভাই এডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। মূলত তিনিই এই আইনি ভয় দেখাচ্ছেন।
পূর্বেও ইট পড়ার বিষয়ে জসিম জানান, দুর্ঘটনার আগেও একদিন ওই ছাদ থেকে একটি ইট তাদের ঘরের ওপর পড়েছিল। তখন বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি বিষয়টিকে পাত্তা না দিয়ে বলেন, তোরা কি পাগল হয়েছিস যে আস্ত দেয়াল ভেঙে পড়বে! বাড়িওয়ালার এই চরম অবহেলার কারণেই আজ তার একমাত্র সন্তানকে হারাতে হয়েছে বলে দাবি জসিমের।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা সরকার আলম নিজেকে বিএনপি নেতা ও সাংবাদিক দাবি করে বলেন, ওদের চিকিৎসার জন্য ৭০ হাজার টাকার মতো দিয়েছি। সে (জসিম) ১০ লাখ টাকা দাবি করছে। আমরা বলেছি, আমাদের কথা শুনলে আমরা কিছু একটা করে দিবো। তবে কী করে দেবেন—তা জানতে চাইলে তিনি এখনই তা বলতে অস্বীকৃতি জানান। জসিমকে এর আগেও ঘর বা দেয়ালের ঝুঁকির বিষয়ে জানানো হয়েছিল এবং তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি—এমন অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন সরকার আলম।
এদিকে, সরকার আলম ও সরকার কামালের আরেক ভাই নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের সাথে গত কয়েকদিনে কয়েকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি গত বৃহস্পতিবার তার হোয়াটস অ্যাপ নাম্বারে ক্ষুদে বার্তা (ঝগঝ) পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
তবে, যে বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে, সেই বাড়ির মালিক লন্ডনে থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
এ বিষয়ে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত) সাজেদুর রহমান বলেন, ভবনের দেয়াল পড়ে গিয়ে একটি বাচ্চা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছে বিষয়টি আমি জানি এবং আমার মনে আছে। কিন্তু তখন অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে কেউ আসে নি।
অসহায় পিতা জসিম মিয়া তার অবুঝ সন্তান হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং স্ত্রীর পঙ্গুত্বের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন প্রশাসনের নিকট।

আপনার মতামত লিখুন :