ঢাকা , বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফতুল্লাবাসীর দুঃখ ঘোচেনি

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় ৩ ঘন্টা আগে
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সোজাসাপটা রিপোর্ট
বর্ষা মৌসুম এখনো আসেনি। তার আগেই বৈশাখের কয়েক দফা বৃষ্টিতেই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা অঞ্চলের বড় একটি অংশের জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তাঘাটই বলে দিচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের কষ্টের চিত্র।
ফতুল্লার লালপুর, পৌষাপুকুরপাড়সহ আশপাশের নিচু এলাকাগুলোতে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও প্রধান সড়কে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয় বরং একটি স্থায়ী দুর্ভোগের নাম।
ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাজী মুঈনুদ্দিন বলেন, “বৃষ্টি নামলেই আতঙ্ক শুরু হয়। রাতের বৃষ্টির পর সকালে দরজা খুললেই হাঁটু সমান পানি দেখা যায়। চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়।”
স্থানীয়দের জীবনে এই জলাবদ্ধতা কেবল অসুবিধা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সংকট। স্কুলগামী শিশুরা ক্লাসে যেতে পারে না, কর্মজীবীরা আটকে পড়েন, আর জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়াও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় পানির সঙ্গে মিশে থাকা বর্জ্য ও নোংরা পরিবেশ স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।
এলাকাজুড়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট। কোথাও খাল ভরাট, কোথাও বর্জ্য জমে পানি চলাচল বন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্প কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
রায়হান কবির নামে লালপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা মনে করি বৃষ্টি মানেই আমরা পানির মধ্যে থাকি। ঘর থেকে বের হতে হলে কাপড় গুটিয়ে নামতে হয়। এতে অনেকের শরীরে দেখা যায় চর্মরোগ। নারীদের পায়ে ঘা এই এলাকায় সাধারণ একটা রোগ। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষের উপার্জনক্ষমতা কম থাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও তারা করতে পারেন না।
ফতুল্লা এলাকার এই জলাবদ্ধতা নতুন নয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০১৬ সালে প্রায় ৫১৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। লক্ষ্য ছিল খাল পুনঃখনন, পাম্প হাউজ নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করা।
২০১৭ সালে কাজ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা দুটোই বেড়ে যায়। ভূমি অধিগ্রহণ ও অতিরিক্ত কাজ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১,২৯৯ কোটি টাকায়।
প্রকল্পটি একাধিকবার সময় বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও ফতুল্লার একটি বড় অংশের মানুষের ভোগান্তি শেষ হয়নি।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ফতুল্লার যে অংশটিতে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে, সেটি ডিএনডি প্রকল্পের আওতাভুক্ত ছিল না।
কিন্তু এতেই ক্ষোভ রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের। তাদের ভাষ্য, ফতুল্লার একটি বড় অংশ বাদ দিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করাই ছিল ভুল। রাজনৈতিক দলাদলির কারণে এটি হয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে রয়েছে। তাছাড়া, ডিএনডি প্রকল্পের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও খালগুলো ঠিকভাবে খনন ও খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ফতুল্লার জলাবদ্ধতা কেবল অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি ব্যবস্থাপনা সংকটও।
নিচু ভূপ্রকৃতি, খাল দখল, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে। বর্ষা এলেই সেই দুর্বলতাগুলো একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এলাকাবাসীর ভাষায়, “প্রকল্প আসে, আলোচনা হয়, কিন্তু পানি ঠিকই আমাদের ঘরে ফিরে আসে।”
ফতুল্লার অনেক এলাকায় বর্ষায় নৌকা বা ভ্যানগাড়িই হয়ে ওঠে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। স্থানীয় রাজনীতিক ও সমাজসেবীদের কেউ কেউ মানুষের সহযোগিতায় এতে কিছুটা ভোগান্তি কমে মানুষের। কিন্তু দীর্ঘ সময় পানিতে হাঁটার কারণে অনেকেই চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশু, রোগী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ।
ফতুল্লাবাসী এ সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
যদিও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনও ফতুল্লাবাসীর এই সমস্যা দূর করতে তৎপর হয়েছেন। তিনি পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে এ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আলাদা প্রকল্প দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

ফতুল্লাবাসীর দুঃখ ঘোচেনি

আপডেট সময় ৩ ঘন্টা আগে

সোজাসাপটা রিপোর্ট
বর্ষা মৌসুম এখনো আসেনি। তার আগেই বৈশাখের কয়েক দফা বৃষ্টিতেই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা অঞ্চলের বড় একটি অংশের জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তাঘাটই বলে দিচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের কষ্টের চিত্র।
ফতুল্লার লালপুর, পৌষাপুকুরপাড়সহ আশপাশের নিচু এলাকাগুলোতে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও প্রধান সড়কে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয় বরং একটি স্থায়ী দুর্ভোগের নাম।
ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাজী মুঈনুদ্দিন বলেন, “বৃষ্টি নামলেই আতঙ্ক শুরু হয়। রাতের বৃষ্টির পর সকালে দরজা খুললেই হাঁটু সমান পানি দেখা যায়। চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়।”
স্থানীয়দের জীবনে এই জলাবদ্ধতা কেবল অসুবিধা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সংকট। স্কুলগামী শিশুরা ক্লাসে যেতে পারে না, কর্মজীবীরা আটকে পড়েন, আর জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়াও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় পানির সঙ্গে মিশে থাকা বর্জ্য ও নোংরা পরিবেশ স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।
এলাকাজুড়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট। কোথাও খাল ভরাট, কোথাও বর্জ্য জমে পানি চলাচল বন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্প কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
রায়হান কবির নামে লালপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা মনে করি বৃষ্টি মানেই আমরা পানির মধ্যে থাকি। ঘর থেকে বের হতে হলে কাপড় গুটিয়ে নামতে হয়। এতে অনেকের শরীরে দেখা যায় চর্মরোগ। নারীদের পায়ে ঘা এই এলাকায় সাধারণ একটা রোগ। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষের উপার্জনক্ষমতা কম থাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও তারা করতে পারেন না।
ফতুল্লা এলাকার এই জলাবদ্ধতা নতুন নয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০১৬ সালে প্রায় ৫১৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। লক্ষ্য ছিল খাল পুনঃখনন, পাম্প হাউজ নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করা।
২০১৭ সালে কাজ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা দুটোই বেড়ে যায়। ভূমি অধিগ্রহণ ও অতিরিক্ত কাজ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১,২৯৯ কোটি টাকায়।
প্রকল্পটি একাধিকবার সময় বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও ফতুল্লার একটি বড় অংশের মানুষের ভোগান্তি শেষ হয়নি।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ফতুল্লার যে অংশটিতে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে, সেটি ডিএনডি প্রকল্পের আওতাভুক্ত ছিল না।
কিন্তু এতেই ক্ষোভ রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের। তাদের ভাষ্য, ফতুল্লার একটি বড় অংশ বাদ দিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করাই ছিল ভুল। রাজনৈতিক দলাদলির কারণে এটি হয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে রয়েছে। তাছাড়া, ডিএনডি প্রকল্পের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও খালগুলো ঠিকভাবে খনন ও খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ফতুল্লার জলাবদ্ধতা কেবল অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি ব্যবস্থাপনা সংকটও।
নিচু ভূপ্রকৃতি, খাল দখল, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে। বর্ষা এলেই সেই দুর্বলতাগুলো একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এলাকাবাসীর ভাষায়, “প্রকল্প আসে, আলোচনা হয়, কিন্তু পানি ঠিকই আমাদের ঘরে ফিরে আসে।”
ফতুল্লার অনেক এলাকায় বর্ষায় নৌকা বা ভ্যানগাড়িই হয়ে ওঠে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। স্থানীয় রাজনীতিক ও সমাজসেবীদের কেউ কেউ মানুষের সহযোগিতায় এতে কিছুটা ভোগান্তি কমে মানুষের। কিন্তু দীর্ঘ সময় পানিতে হাঁটার কারণে অনেকেই চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশু, রোগী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ।
ফতুল্লাবাসী এ সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
যদিও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনও ফতুল্লাবাসীর এই সমস্যা দূর করতে তৎপর হয়েছেন। তিনি পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে এ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আলাদা প্রকল্প দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।