স্টাফ রিপোর্টার
দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অলিখিত ও অদৃশ্য উৎস থেকে জ্বালানি তেল আসে, যার পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। বিদেশ থেকে আসা জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে বিভিন্ন উপায়ে সরকারি হিসাবের বাইরে বিপুল পরিমাণ তেল আনা হয় এবং তা অনানুষ্ঠানিকভাবে কেনাবেচা হয়।
কাগজে-কলমে বিষয়টি অবৈধ হলেও এটি এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের একটি বড় অংশের গ্রাহকের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করা হলে, মাদার ভেসেলের তেল হয়তো পানিতেই পড়ে থাকবে, কিন্তু দেশের জ্বালানি সংকট আরও তীব্রতর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তেলের রেশনিং জটিলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। পেট্রল পাম্প মালিকরা বলছেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন না করে আমলাদের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত জনভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলবে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি কর্মকর্তারা কতটা সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে তেল সংকট নিরসনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ উল্টো ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএসটিআইয়ের অভিযান নিয়ে নতুন শঙ্কা
বিএসটিআইয়ের পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন ডিপো ও পাম্পে জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, এমনিতেই পাম্পগুলোতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত।
দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ অতিষ্ঠ, কর্মচারীরাও হিমশিম খাচ্ছেন। এই অবস্থায় যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। অতিরিক্ত ঝামেলা এড়াতে অনেক পাম্প মালিক পাম্প বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, গত ১৭ বছর ধরে যেভাবে আমলাদের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে এবং তারা অনেকেই নানাভাবে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছেন। তাই এসব আমলা দিয়ে অভিযান পরিচালনা বর্তমানে কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডিপো থেকে পাম্পগুলো যে তেল নিচ্ছে, সেখানে মানের ঘাটতি হচ্ছে নাকি পাম্পে আসার পর তেলের মান হারাচ্ছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অর্থাৎ গোড়ায় গলদ আছে কি না, তাও যাচাই করা দরকার, বলেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলছেন, আমলাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পরই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। যখন দরকার ছিল তখন রেশনিং করেনি, যখন করেছে সেটাও সঠিকভাবে করতে পারেনি। ফলে সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হয়েছে। এখন আবার বলছে মান যাচাই করবে। এই সংকটকালে এই ধরনের উদ্যোগ পুরো পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করবে বলে মনে করেন তিনি।
এক শ্রেণির আমলা পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিক তদারকির নামে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে কোনো কোনো আমলা ভূমিকা রাখছেন কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। তবে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পাম্প মালিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ‘কতদিনের তেল মজুদ আছে’ এই ধরনের তথ্য প্রকাশ জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়। মন্ত্রীদের দিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ানোর পেছনেও আমলাদের পরামর্শ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেশনিংয়ের ‘ভুল’ অঙ্ক ও লোকসান
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু ১৫ মার্চ জনভোগান্তির মুখে তা প্রত্যাহার করতে হয়। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রেশনিংয়ের সময় ও পদ্ধতি উভয়ই ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
সাড়ে ১৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাঙ্কারে মাত্র সাড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা ট্যাঙ্কারগুলোর পরিবহন খরচ ও চালকের মজুরি বহন করার পর এত অল্প তেল নেওয়ায় প্রতিটি ট্রিপেই লোকসান গুনতে হয়েছে। এ কারণে অনেক পাম্প মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করেননি।
ঈদের ছুটি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কার মধ্যে এমন সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঈদুল ফিতরে টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাম্প মালিকদের তেল উত্তোলন সম্ভব হয়নি। ফলে ওই সময়ে পাম্পগুলোতে তীব্র তেল সংকট দেখা দেয়। এতে সাধারণ মানুষ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করতে শুরু করে।
ব্যাংক বন্ধ থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি কেন, এ প্রশ্নও উঠেছে। আমলাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা তাদের অদূরদর্শিতা, অদক্ষতা নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মক চাপে পড়ছে।
সংবাদ শিরোনাম ::
বেশি খাওয়ার চিন্তা বাদ দিতে হবে— মামুন মাহমুদ
হকারদের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন
ফতুল্লায় তিন কারখানায় অভিযান
হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ১৫ শিশু
হেরোইন ও ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৫
শ্বাসকষ্টে নীল মুখ, হামে কাবু শিশুরা
দেশ ছাড়ার চেষ্টা আন্ডা রফিকের
কড়াকড়ি আরোপে তীব্র জ্বালানি সংকট
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও শহীদ জিয়ার আন্তর্জাতিকতা
কড়াকড়ি আরোপে তীব্র জ্বালানি সংকট
-
ডেস্ক : - আপডেট সময় ৩ ঘন্টা আগে
- ০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ




















