ঢাকা , বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হকারদের ইন্ধনদাতা কারা?

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সাব্বির হোসেন
নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাত দখল ও হকার ইস্যু নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন-এর নির্দেশনায় নগরজুড়ে পরিচালিত হয় হকার উচ্ছেদ অভিযান। প্রশাসনের কড়াকড়ি অবস্থানের ফলে প্রথমদিকে শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেও সেই চিত্র বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও ফুটপাত দখল করে বসতে শুরু করে হকাররা, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কারা দিচ্ছে তাদের ইন্ধন?
উচ্ছেদ অভিযানের পর সাধারণ মানুষ মনে করেছিল এবার হয়তো দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের চাষাঢ়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, কালিরবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবারও হকারদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হকাররা শুধুমাত্র নিজেরাই ফিরে আসছে না বরং তাদের পেছনে রয়েছে একটি সংগঠিত শক্তি, যারা পরিকল্পিতভাবে তাদের পুনর্বাসনের আগেই ফুটপাতে বসতে উৎসাহিত করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক হকার স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নেতাদের ছত্রচ্ছায়া পেয়েই তারা প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে আবারও ফুটপাত দখল করছে।
বিশেষ করে গত ২০ এপ্রিল সকালে হকারদের পুনর্বাসনের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
সেই মিছিলে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাহী সমন্বয়কারী এবং গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অঞ্জন দাস এবং সিপিবির ইকবাল হোসেন। তাদের সরব উপস্থিতি অনেকের কাছে ইঙ্গিত দিচ্ছে—হকারদের আন্দোলন শুধুমাত্র জীবিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণও।
স্থানীয় সূত্র বলছে, অঞ্জন দাস ও ইকবাল হোসেন প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিলেও নেপথ্যে রয়েছে আরও প্রভাবশালী একটি মহল। এরা সরাসরি সামনে না এলেও হকারদের সংগঠিত করছে, অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ করছে।
এই দূরের নিয়ন্ত্রকরা মূলত তিন ধরনের হতে পারে,স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব,,চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট,কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা ফুটপাত দখলকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
হকার ইস্যুটি শুধু রাজনৈতিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফুটপাত দখল করে প্রতিদিন যে পরিমাণ লেনদেন হয়, তার একটি অংশ যায় নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের হাতে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে এই অবৈধ অর্থ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে অনেকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের হকারদের আবার মাঠে নামাতে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, হকারদের পুনর্বাসন জরুরি হলেও তা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত হকার বসার কারণে যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ এবং শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একদিকে হকারদের জীবিকা, অন্যদিকে নগরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই সমস্যা সমাধান হবে না, বরং এর পেছনের ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এই চক্র চলতেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংকট নিরসনে প্রয়োজন, স্বচ্ছ ও স্থায়ী পুনর্বাসন পরিকল্পনা,রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ,হকার সিন্ডিকেট ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। নয়তো উচ্ছেদ-ফিরে আসা এই চক্র থেকে মুক্তি পাবে না নারায়ণগঞ্জ শহর।
হকাররা শুধুমাত্র জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামছে—এটা আংশিক সত্য। বাস্তবতা হলো, তাদের পেছনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থে এই সংকটকে টিকিয়ে রাখছে। সেই নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত না করা পর্যন্ত হকারমুক্ত শহরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

হকারদের ইন্ধনদাতা কারা?

আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে

সাব্বির হোসেন
নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাত দখল ও হকার ইস্যু নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন-এর নির্দেশনায় নগরজুড়ে পরিচালিত হয় হকার উচ্ছেদ অভিযান। প্রশাসনের কড়াকড়ি অবস্থানের ফলে প্রথমদিকে শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেও সেই চিত্র বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও ফুটপাত দখল করে বসতে শুরু করে হকাররা, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কারা দিচ্ছে তাদের ইন্ধন?
উচ্ছেদ অভিযানের পর সাধারণ মানুষ মনে করেছিল এবার হয়তো দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের চাষাঢ়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, কালিরবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবারও হকারদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হকাররা শুধুমাত্র নিজেরাই ফিরে আসছে না বরং তাদের পেছনে রয়েছে একটি সংগঠিত শক্তি, যারা পরিকল্পিতভাবে তাদের পুনর্বাসনের আগেই ফুটপাতে বসতে উৎসাহিত করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক হকার স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নেতাদের ছত্রচ্ছায়া পেয়েই তারা প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে আবারও ফুটপাত দখল করছে।
বিশেষ করে গত ২০ এপ্রিল সকালে হকারদের পুনর্বাসনের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
সেই মিছিলে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাহী সমন্বয়কারী এবং গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অঞ্জন দাস এবং সিপিবির ইকবাল হোসেন। তাদের সরব উপস্থিতি অনেকের কাছে ইঙ্গিত দিচ্ছে—হকারদের আন্দোলন শুধুমাত্র জীবিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণও।
স্থানীয় সূত্র বলছে, অঞ্জন দাস ও ইকবাল হোসেন প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিলেও নেপথ্যে রয়েছে আরও প্রভাবশালী একটি মহল। এরা সরাসরি সামনে না এলেও হকারদের সংগঠিত করছে, অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ করছে।
এই দূরের নিয়ন্ত্রকরা মূলত তিন ধরনের হতে পারে,স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব,,চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট,কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা ফুটপাত দখলকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
হকার ইস্যুটি শুধু রাজনৈতিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফুটপাত দখল করে প্রতিদিন যে পরিমাণ লেনদেন হয়, তার একটি অংশ যায় নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের হাতে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে এই অবৈধ অর্থ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে অনেকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের হকারদের আবার মাঠে নামাতে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, হকারদের পুনর্বাসন জরুরি হলেও তা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত হকার বসার কারণে যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ এবং শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একদিকে হকারদের জীবিকা, অন্যদিকে নগরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই সমস্যা সমাধান হবে না, বরং এর পেছনের ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এই চক্র চলতেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংকট নিরসনে প্রয়োজন, স্বচ্ছ ও স্থায়ী পুনর্বাসন পরিকল্পনা,রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ,হকার সিন্ডিকেট ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। নয়তো উচ্ছেদ-ফিরে আসা এই চক্র থেকে মুক্তি পাবে না নারায়ণগঞ্জ শহর।
হকাররা শুধুমাত্র জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামছে—এটা আংশিক সত্য। বাস্তবতা হলো, তাদের পেছনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থে এই সংকটকে টিকিয়ে রাখছে। সেই নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত না করা পর্যন্ত হকারমুক্ত শহরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন।