ঢাকা , সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিত্যপণ্যের দামে হাঁসফাঁস

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

সোজাসাপটা রিপোর্ট
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই বাড়ছে পণ্যের দাম। চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ-মাংস, এলপিজি গ্যাসসহ প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের দিগুবাবুর, নিতাইগঞ্জ, কালিরবাজার, দেওভোগ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। বাজার করতে এসে অনেক ক্রেতাকেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে দেখা যায়। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছে, কম খাচ্ছে পুষ্টিকর খাবারও।
চাষাঢ়া বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে মাসে যে টাকায় সংসার চলতো এখন সেই টাকায় অর্ধেক মাসও চলে না। বাজারে ঢুকলেই মনে হয় আগুনের মধ্যে পড়েছি।”
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। কয়েক মাসের ব্যবধানে কাঁচা পেঁপে, বেগুন, কাঁচকলা, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে বেগুন কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কাঁচকলা প্রতি হালি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে সরবরাহ কমে গেছে।
নিতাইগঞ্জের এক সবজি ব্যবসায়ী জানান, “ডিজেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। মোকাম থেকে মাল আনতেই এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগে। সেই প্রভাব বাজারে পড়ছে।”
ডিমের বাজারেও বেড়েছে অস্থিরতা। কয়েক মাস স্থিতিশীল থাকার পর এখন প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। এছাড়া সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়। মাঝারি মানের চালও কেজিতে কয়েক টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এলপিজি গ্যাস ব্যবহারকারীরা। সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৯৪০ টাকা হলেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ২২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জের গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, “গ্যাস, তেল, চাল—সব কিছুর দাম বাড়ছে। এখন সংসার চালাতে গিয়ে ধারদেনা করতে হচ্ছে।”
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আলোচনা নয়, এখন কার্যকর বাজার তদারকি জরুরি। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, মজুদদারি ও সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারা নিত্যপণ্যে কর-ভ্যাট কমানো, টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানো এবং বাজারে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
নিত্যপণ্যের এমন ঊর্ধ্বগতিতে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। অনেকেই বলছেন, আয় না বাড়লেও প্রতিদিন বাড়ছে খরচ। ফলে জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

নিত্যপণ্যের দামে হাঁসফাঁস

আপডেট সময় ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

সোজাসাপটা রিপোর্ট
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই বাড়ছে পণ্যের দাম। চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ-মাংস, এলপিজি গ্যাসসহ প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের দিগুবাবুর, নিতাইগঞ্জ, কালিরবাজার, দেওভোগ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। বাজার করতে এসে অনেক ক্রেতাকেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে দেখা যায়। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছে, কম খাচ্ছে পুষ্টিকর খাবারও।
চাষাঢ়া বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে মাসে যে টাকায় সংসার চলতো এখন সেই টাকায় অর্ধেক মাসও চলে না। বাজারে ঢুকলেই মনে হয় আগুনের মধ্যে পড়েছি।”
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। কয়েক মাসের ব্যবধানে কাঁচা পেঁপে, বেগুন, কাঁচকলা, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে বেগুন কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কাঁচকলা প্রতি হালি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে সরবরাহ কমে গেছে।
নিতাইগঞ্জের এক সবজি ব্যবসায়ী জানান, “ডিজেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। মোকাম থেকে মাল আনতেই এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগে। সেই প্রভাব বাজারে পড়ছে।”
ডিমের বাজারেও বেড়েছে অস্থিরতা। কয়েক মাস স্থিতিশীল থাকার পর এখন প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। এছাড়া সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়। মাঝারি মানের চালও কেজিতে কয়েক টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এলপিজি গ্যাস ব্যবহারকারীরা। সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৯৪০ টাকা হলেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ২২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জের গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, “গ্যাস, তেল, চাল—সব কিছুর দাম বাড়ছে। এখন সংসার চালাতে গিয়ে ধারদেনা করতে হচ্ছে।”
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আলোচনা নয়, এখন কার্যকর বাজার তদারকি জরুরি। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, মজুদদারি ও সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারা নিত্যপণ্যে কর-ভ্যাট কমানো, টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানো এবং বাজারে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
নিত্যপণ্যের এমন ঊর্ধ্বগতিতে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। অনেকেই বলছেন, আয় না বাড়লেও প্রতিদিন বাড়ছে খরচ। ফলে জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।