ঢাকা , শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নগরীতে বেড়েছে ডাকাতি!

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সাব্বির হোসেন
নারায়ণগঞ্জ নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ডাকাতির ঘটনা। একের পর এক সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চাষাঢ়া, ফতুল্লা, মাসদাইর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডনচেম্বারসহ বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গভীর রাতে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল বাসাবাড়ি টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১০ জনের একটি দল অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ফেলে। এরপর স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। কোথাও কোথাও ডাকাতরা বাড়ির মালিকদের মারধর এমনকি হাত-পা বেঁধে রেখে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম জানান, আমাদের পাশের বাসায় কয়েকদিন আগে ডাকাতি হয়েছে। রাত ২টার দিকে ৮-১০ জন ডাকাত এসে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। আমরা এতটাই আতঙ্কে আছি যে, এখন এলাকাবাসী মিলে রাতে পাহারা দিচ্ছি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার গৃহবধূ রাশিদা আক্তার। তিনি বলেন, রাতে ঘুমাতে পারি না। ছোট বাচ্চা নিয়ে সব সময় ভয় লাগে। আশেপাশে প্রায়ই ডাকাতির খবর পাচ্ছি। পুলিশে জানালেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখি না।
চাষাঢ়া এলাকার ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, দিনে ব্যবসা করি, রাতে বাড়িতে থাকি আতঙ্ক নিয়ে। শহরের মতো জায়গায় যদি এভাবে ডাকাতি বাড়ে, তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ থাকবো?
নগরবাসীর অভিযোগ, ডাকাতির ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। অনেক সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
একাধিক ভুক্তভোগী জানান, থানায় অভিযোগ করার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো ফল পাওয়া যায় না। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ডাকাতির ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নাগরিকদেরও সচেতন থাকতে হবে। অপরিচিত কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ছে না। তারা বলছেন, টহল জোরদারের কথা বলা হলেও অনেক এলাকায় রাতে পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায় না। ফলে ডাকাতরা সুযোগ বুঝে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
নগরীতে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বেকারত্ব, মাদক ব্যবসার বিস্তার, এবং সামাজিক অবক্ষয়। অনেক তরুণ সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
এছাড়া, নগরীর দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অপরাধীরা সহজেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারছে, যা তাদের শনাক্ত করা কঠিন করে তুলছে।
শুধুমাত্র টহল বাড়িয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
প্রতিটি এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এদিকে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
নগরবাসীর একটাই প্রত্যাশা নিরাপদ জীবন। তারা চান, প্রশাসন দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ডাকাতির এই আতঙ্ক থেকে তাদের মুক্তি দিক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

নগরীতে বেড়েছে ডাকাতি!

আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে

সাব্বির হোসেন
নারায়ণগঞ্জ নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ডাকাতির ঘটনা। একের পর এক সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চাষাঢ়া, ফতুল্লা, মাসদাইর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডনচেম্বারসহ বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গভীর রাতে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল বাসাবাড়ি টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১০ জনের একটি দল অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ফেলে। এরপর স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। কোথাও কোথাও ডাকাতরা বাড়ির মালিকদের মারধর এমনকি হাত-পা বেঁধে রেখে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম জানান, আমাদের পাশের বাসায় কয়েকদিন আগে ডাকাতি হয়েছে। রাত ২টার দিকে ৮-১০ জন ডাকাত এসে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। আমরা এতটাই আতঙ্কে আছি যে, এখন এলাকাবাসী মিলে রাতে পাহারা দিচ্ছি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার গৃহবধূ রাশিদা আক্তার। তিনি বলেন, রাতে ঘুমাতে পারি না। ছোট বাচ্চা নিয়ে সব সময় ভয় লাগে। আশেপাশে প্রায়ই ডাকাতির খবর পাচ্ছি। পুলিশে জানালেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখি না।
চাষাঢ়া এলাকার ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, দিনে ব্যবসা করি, রাতে বাড়িতে থাকি আতঙ্ক নিয়ে। শহরের মতো জায়গায় যদি এভাবে ডাকাতি বাড়ে, তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ থাকবো?
নগরবাসীর অভিযোগ, ডাকাতির ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। অনেক সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
একাধিক ভুক্তভোগী জানান, থানায় অভিযোগ করার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো ফল পাওয়া যায় না। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ডাকাতির ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নাগরিকদেরও সচেতন থাকতে হবে। অপরিচিত কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ছে না। তারা বলছেন, টহল জোরদারের কথা বলা হলেও অনেক এলাকায় রাতে পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায় না। ফলে ডাকাতরা সুযোগ বুঝে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
নগরীতে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বেকারত্ব, মাদক ব্যবসার বিস্তার, এবং সামাজিক অবক্ষয়। অনেক তরুণ সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
এছাড়া, নগরীর দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অপরাধীরা সহজেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারছে, যা তাদের শনাক্ত করা কঠিন করে তুলছে।
শুধুমাত্র টহল বাড়িয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
প্রতিটি এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এদিকে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
নগরবাসীর একটাই প্রত্যাশা নিরাপদ জীবন। তারা চান, প্রশাসন দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ডাকাতির এই আতঙ্ক থেকে তাদের মুক্তি দিক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে।