সোজাসাপটা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দূরত্ব ২৩০ কিলোমিটার। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন-খ্যাত মহাসড়কটির এ অংশের দুই পাশে মিলেছে ৪৮১টি ফিডার রোড।
এ তথ্য হাইওয়ে পুলিশের। মহাসড়কটিতে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশ সদস্যদের পর্যবেক্ষণ বলছে, সার্ভিস লেন না থাকায় ফিডার রোডের সংযোগে গণপরিবহন থেকে যাত্রী ওঠানামার সময় বিশৃঙ্খলা ও যানজট হচ্ছে। একইভাবে ফিডার রোড থেকে মূল মহাসড়কে ছোট যানবাহনের অবাধ প্রবেশের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৯৮ হাজার গাড়ি চলে। তবে এলাকাভেদে এ সংখ্যা কমবেশি হয়। সব মিলিয়ে এ মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ হাজার যানবাহন যাতায়াত করে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড ও শিমরাইল অংশে গাড়ির চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। মহাসড়কটিতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ যানবাহন চলছে বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়কে সার্ভিস লেন থাকা অপরিহার্য হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে তা না থাকায় দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির ছোট যানগুলো একই লেনে চলছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ যানজটের কারণ হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, সানারপাড়, শিমরাইল (চিটাগং রোড), কাঁচপুর ও মদনপুর মোড় এলাকায় সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া কুমিল্লার দাউদকান্দি, গৌরীপুর, চান্দিনা, নিমসার বাজার ও পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকাগুলোও যাত্রী ও যানবাহনের চাপে সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। ফেনীর মহীপাল থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বারৈয়ারহাট, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এলাকাগুলোতেও ফিডার রোড থেকে আসা ছোট যানবাহনের কারণে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানারপাড় বাসস্ট্যান্ড এলাকা সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের দুই পাশে সরাসরি এসে মেশা ছোট ছোট ফিডার রোড থেকে রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনগুলো সরাসরি মূল মহাসড়কে উঠে পড়ছে। এতে দ্রুতগামী দূরপাল্লার বাসগুলোকে হুটহাট ব্রেক কষতে হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করছে। রাস্তার ওপরেই এলোমেলোভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং মোড়গুলো ঘিরে গড়ে ওঠা দোকানপাটের ভিড়ে পুরো এলাকায় এক চরম বিশৃঙ্খলাও চোখে পড়ে।
শুধু সানারপাড় নয়, পুরো মহাসড়কে একই চিত্র পাওয়া যাবে বলে বণিক বার্তাকে জানান হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান। তিনি বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যেসব পয়েন্টে ফিডার রোড এসে মিলেছে, সেসব পয়েন্ট ঘিরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাতে দেখা যায়। আবার এ পয়েন্টগুলো ঘিরে স্থায়ী-অস্থায়ী দোকানও গড়ে উঠেছে। জনসমাগমও প্রায় সবসময় থাকে। মহাসড়কে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে ফিডার রোডের সংযোগ স্থলগুলো প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। আবার ফিডার রোড থেকে স্থানীয় ছোট যানবাহন অবাধে মহাসড়কে চলে আসছে। ফিডারগুলো শুধু বিশৃঙ্খলা নয়, প্রায়ই দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে উঠছে।’
দুর্ঘটনা-বিশৃঙ্খলার কারণ সত্ত্বেও ফিডার রোডের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মানুষের প্রয়োজনেই এ ফিডার রোডগুলো নির্মিত হয়েছে। সড়কে ফিডার রোড থাকবেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যদি স্থানীয় যানবাহনের জন্য সার্ভিস লেন থাকত, তাহলে কিন্তু কোনো সমস্যা হতো না।’
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি আরো প্রশস্ত করা, মহাসড়কটি এক্সপ্রেসওয়ে মানে উন্নীতকরণের মতো পরিকল্পনা নিয়ে সরকার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বিগত সময়ে মহাসড়কটি উন্নয়নে সমীক্ষাও করা হয়েছে। বর্তমানে সড়কটির নকশা চূড়ান্তকরণের কাজ চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এক্সপ্রেসওয়ে মানে উন্নীত করতে আমরা এরই মধ্যে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করেছি। এ নকশা অনুযায়ী, মহাসড়কটির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উড়ালপথে হবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে একটি প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত মহাসড়ক হিসেবে গড়ে তোলার। এটা করতে পারলে এ মহাসড়কের মূল অংশের সঙ্গে কোনো ফিডার রোডের সংযোগ থাকবে না।’
সড়কটির উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে কী পরিমাণ ব্যয় হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা একটা প্রাক্কলন করেছি। তবে এ প্রাক্কলনের এখনো অনেক বিষয় জড়িত, যে কারণে তা চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত হলে তা জানিয়ে দেয়া হবে।’
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এক্সপ্রেসওয়ে বা ১০ লেনে উন্নীত করা দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। কাজ বাস্তবায়ন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। এমন প্রেক্ষাপটে মহাসড়কটিতে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেয়ারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো একটি ইকোনমিক লাইফলাইনে ৪৮১টি ফিডার রোড সরাসরি যুক্ত করা বড় ধরনের পরিকল্পনার ভুল। এলজিইডি বা পৌরসভা যখন এ রাস্তাগুলো বানিয়েছে, তখন প্ল্যানিং কমিশনের উচিত ছিল এগুলো স্ক্রিনিং করা। একদিকে আমরা মহাসড়কে ধীরগতির যান বন্ধের কথা বলছি, অন্যদিকে ফিডার রোডের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবেই সেগুলোকে মহাসড়কে তুলে দিচ্ছি। এ “শর্ট সার্কিট” ব্যবস্থার কারণেই দুর্ঘটনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’
মহাসড়কটির দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে, তাই এখন কারিগরি সমাধান বা “ইঞ্জিনিয়ারিং মেজার” নিতে হবে। সংযোগস্থলগুলোতে এমনভাবে ইন্টারসেকশন ডিজাইন করতে হবে যেন ধীরগতির যানবাহন হুটহাট মূল রাস্তায় উঠতে না পারে। ভবিষ্যতে ১০ লেনের কাজ শেষ হওয়ার আগে যেন নতুন কোনো ফিডার রোড যুক্ত না হয়, সেদিকে প্ল্যানিং কমিশনকে কঠোর হতে হবে। শত শত পয়েন্টে পুলিশ দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সঠিক নকশাই একমাত্র সমাধান।’
সংবাদ শিরোনাম ::
ধর্ষণ মামলায় যুবদল নেতা গ্রেপ্তার
পানির সংকট কাটাতে নতুন উদ্যোগ
পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার
আল-ফাতাহ পরিষদের সমাবেশ
বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম স্থগিত
রূপগঞ্জ যুক্ত হচ্ছে ঢাকায়
২৩০ কিলোমিটার পথে ৪৮১ ‘ফিডার রোড’
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর
‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সরকার আন্তরিক’
‘আন্দোলনে কোনো বিশ্রাম নেব না’
২৩০ কিলোমিটার পথে ৪৮১ ‘ফিডার রোড’
-
ডেস্ক : - আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে
- ০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ




















