সোজাসাপটা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র। ঘিঞ্জি এলাকায় প্রচুর ঘনবসতি থাকায় এটিকে অনেকে ‘চনপাড়া বস্তি’ বলেও চেনেন। রাজধানীর একেবারে কাছেই গড়ে ওঠা একটি ঘনবসতিপূর্ণ পুনর্বাসন এলাকা, যেখানে বসবাস করছে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ মানুষ। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্বের পাশাপাশি এই এলাকার আরেকটি পরিচিতি রয়েছে- অপরাধপ্রবণ জনপদ হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষায়, “সরকার বদলায়, কিন্তু চনপাড়ার চেহারা বদলায় না।”
দীর্ঘদিন ধরে চনপাড়া মাদক, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে এখানে অপরাধ একটি ‘ব্যবস্থায়’ পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানে এখন বিএনপির লোকজন বসেছে। এই সময়ে কিছু ‘লোক দেখানো’ প্রকাশ্য পরিবর্তন হয়েছে বটে, তবে মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে খুন-গুম-চাঁদাবাজি-দ্বন্দ্ব যথারীতি অব্যাহত থাকায় ‘ভয়-ভীতি আর আতঙ্ক’ আগের মতই আছে।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চনপাড়ায় নতুন লোকজন দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে’ চারটি খুন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার এসব ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদেরও আওয়ামী লীগের লোকজনের মত চনপাড়া ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে; অথবা তারা ভয়ে আর চনপাড়ার পথ মাড়াচ্ছেন না।
রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া এক সময় ছিল ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) ১২৬ একর জমির ওপর দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়িঘর হারানো আশ্রয়হীন মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। নাম দেওয়া হয় ‘চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র’।
শুরুতে সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবারের পুনর্বাসন হলেও বর্তমানে চনপাড়ার বাসিন্দা লক্ষাধিক। ভোটার রয়েছেন প্রায় ২২ হাজার। ভোটার হালনাগাদের সবশেষ তালিকা ধরলে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চনপাড়ার ভাসমান লোকজন শুরুতে দিনমজুরের কাজ করতেন। তবে আশির দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চলে মাদক কেনাবেচা শুরু হয়। একাধিক ‘বাহিনী’ মাদক বেচা-কেনার পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়’ মাদক চোরাকারবারি ও অপরাধীদের ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে এ এলাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও ব্যবহার অনেকটা কমে গেলেও চনপাড়ায় এখনো ‘হোম সার্ভিস’ চালু আছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চনপাড়া গ্রামে স্থলপথে ঢোকার একমাত্র পথ ডেমরা থেকে বালু সেতু হয়ে। সেতু পার হলেই চনপাড়া মোড়। চনপাড়াকে নয়টি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের অসংখ্য অলিগলি। বাড়িঘর একটার সঙ্গে অন্যটা লাগোয়া।
দুই দিকে শীতলক্ষ্যা নদী এবং একদিকে বালু নদ। পাশের ডেমরা, নোয়াপাড়া ও মুড়াপাড়া থেকে নদীপথে চনপাড়ায় ঢোকা যায়। রয়েছে একাধিক খেয়াঘাট।
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ জানায়, বেশিরভাগ মাদকের চালান চনপাড়ায় ঢোকে জলপথে। স্থলপথেও অভিনব কায়দায় মাদকের ছোট-বড় চালান আনা হয়। অস্ত্র কেনা-বেচাও চলে এখানে। এমনকি অপরাধীদের কাছে আত্মগোপনে থাকার জায়গা হিসেবেও চনপাড়া গুরুত্বপূর্ণ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অতীতে স্থানীয় ইউপি সদস্য বজলুর রহমানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। তার সঙ্গে সংরক্ষিত নারী সদস্য বিউটি আক্তার ওরফে কুট্টি, তার স্বামী হাসান, শাহীন ওরফে সিটি শাহীনসহ একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী চনপাড়ার মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করত। এলাকায় একাধিক বাহিনী সক্রিয় ছিল এবং তাদের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা চলত নিয়মিত।
সময়ের ব্যবধানে এসব ‘কন্ট্রোলারদের’ অনেকেই নিহত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও অপরাধের ধারা বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের মতে, “একজন যায়, আরেকজন আসে”- এই চক্রের মধ্যেই আটকে আছে চনপাড়া।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে সেই পরিবর্তন আসেনি। বরং নতুন প্রভাববলয়ের অধীনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপ- এমন অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওইদিন একজন মারা যান, আরও দুইজন গুলিতে গুরুতর আহত হন। ওই সংঘর্ষের ঘটনায় উঠে আসে স্থানীয় যুবদল নেতা শামীম মিয়ার নাম। যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও হত্যার অভিযোগে মামলাসহ মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেরও অভিযোগ।
গত ৫ মে ভোরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হন রূপগঞ্জ থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক শামীম মিয়া। তাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হলেও মুহুর্তের মধ্যে পুলিশকে ঘিরে ধরে তার পরিবারের লোকজন ও অনুসারীরা। পুলিশকে বেশকিছুক্ষণ অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখে হামলা চালিয়ে শামীম মিয়াকে নিয়ে পালিয়ে যান।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন ওই ঘটনার বর্ণনায় জানান, অস্ত্র আইনের একটি মামলায় শামীম মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু পরে তার অনুসারীরা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এরপর হামলা চালিয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। কয়েকশ’ ব্যক্তি হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের উপর হামলা চালায়।এতে ওসি নিজেসহ সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই ঘটনার পর এখন পর্যন্ত শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে, তার স্ত্রীসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
একাধিক মামলার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা চনপাড়াকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে বলেও অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, আগেও এই ধরনের ঘটনা ঘটতো। চনপাড়ায় প্রভাববিস্তারকারী কাউকে গ্রেপ্তার করতে এলেই হামলার শিকার হতে হতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।
সর্বশেষ র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়া রাশেদুল ইসলাম শাহীন ওরফে সিটি শাহীনকেও একাধিকবার গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। এমনকি বজলুর রহমান ও পরবর্তীতে সমসের আলীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, চনপাড়ার ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা। তিনদিকে নদী ও একদিকে সীমিত প্রবেশপথ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে এমনও দেখা গেছে, অভিযানের সময় মুহূর্তেই শত শত মানুষ জড়ো হয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে, ফলে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যায়।
এলাকাটিতে মাদক ব্যবসা যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এখানে দুই শতাধিক মাদক বিক্রেতা সক্রিয় এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাদকের ‘হাট’ বসে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে এখানে মাদক সংগ্রহ করে।
শুধু অপরাধ নয়, চনপাড়ার জীবনযাত্রার মানও অত্যন্ত নাজুক। সরু রাস্তা, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ, ঘনবসতি এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব, সব মিলিয়ে এটি একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক চক্র- সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধ দমন কঠিন হয়ে পড়েছে।
চনপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও চনপাড়ার চিত্র বদলানোর আশ্বাস বারবার এলেও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ার কারণেই মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয়রা নতুন চনপাড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বর্তমানে বিএনপির সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু নিজে চনপাড়ায় গিয়ে মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুবদল নেতাকে গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা ও আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এই এলাকার মানুষ আবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের কথায়, “শুধু অভিযান না, স্থায়ী সমাধান দরকার। না হলে চনপাড়া কখনো বদলাবে না।”
সংবাদ শিরোনাম ::
পুরনো রূপে ফিরছে চনপাড়া
-
ডেস্ক : - আপডেট সময় ২ ঘন্টা আগে
- ০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ নিউজ




















