ঢাকা , রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
চিহ্নিত হচ্ছে এসপিদের রাজনৈতিক পরিচয়

নারায়ণগঞ্জের এসপি আওয়ামীপন্থি ও সুবিধাভোগী

পুলিশ সুপারদের (এসপি) রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে খোদ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদন আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। এর ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এ শীর্ষ পদে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পদায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো এসপি পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি অংশ কর্মরত। এছাড়া জামায়াতপন্থি এসপিদের সংখ্যাও কম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের ৬৪ জেলার এসপিদের মধ্যে বিএনপিপন্থি ১৬, জামায়তপন্থি ৩২ এবং আওয়ামী ও মধ্যমপন্থি হিসাবে ৮ জন করে কর্মরত ছিলেন ১৬ জন।
এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত নয় জেলার এসপি বদল করা হয়েছে। এগুলো হলো-সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, হবিগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, মাগুরা, মাদারীপুর ও খাগড়াছড়ি। তবে দুইজন বিএনপিপন্থি না হওয়ায় এ পদায়ন নিয়ে কিছুটা ক্ষোভও রয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরে। যদিও পুলিশের মধ্যে পেশাদার হিসাবে পরিচিত কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা মনে করেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ বাহিনীকে সত্যিকারার্থে দলমতনিরপেক্ষ শক্তিশালী পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। যদি কোনো সরকার এমন চিন্তা থেকে কঠিন কাজটা শুরু না করে, তাহলে পুলিশের পেশাদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোনো লাভ নেই। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজিপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি তো একটি দল করি। এক অর্থে সরকারের অংশ। তাই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এ ধরনের তালিকা করা বা তালিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু ঠিক হচ্ছে-বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে মতামত দেব। আমি মিডিয়ায় সব কথা বলতে পারব না। বিষয়টা আপনারা বুঝে নিন।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। যেভাবে দলীয় ট্যাগ দিয়ে তালিকা করা হচ্ছে, সেটি মোটেও ঠিক নয়। পদায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা ও সততা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন যেভাবে তালিকা বা পদায়ন করা হচ্ছে, সেটি তো প্রভাবিত মতামত।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এসপিদের আমলনামা এরই মধ্যে সংগ্রহ করেছে সরকার। তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক আদর্শও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে করা ওই প্রতিবেদনটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের একটি কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা জেলার এসপি মিজানুর রহমান আওয়ামী লীগ আমলে এসপি পদে পদোন্নতি পান। গত নভেম্বরে তিনি ঢাকা জেলায় যোগদান করেন। মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি পেলেও ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং ছিল না। ট্রেনিং সেন্টারে কাজ করেছি।
নারায়ণগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামীপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। ২৫তম বিসিএস কর্মকর্তা উখিয়া সার্কেলে এএসপি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র‌্যাব ও পিবিআইতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এবং সর্বশেষ পঞ্চগড় জেলা পুলিশের এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দীনের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী লীগের আংশিক সুবিধাভোগী। পদোন্নতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলে। গাজীপুরে যোগদানের আগে বরিশালের পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল ফারুকের বিষয়ে গোপনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হলেও আওয়ামী আমলের আংশিক সুবিধাভোগী। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন। আব্দুল্লাহ আল ফারুক যুগান্তরকে বলেন, আমি পদোন্নতি পেয়েছি ২০২০ সালে। আওয়ামী লীগের আমলে ভালো কোনো পোস্টিং পাইনি। চার বছর ছিলাম ট্রেনিং সেন্টারে।
মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলমের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে আংশিক সুবিধাভোগী জামায়াতপন্থি অফিসার। পদোন্নতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলেই। মানিকগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ সারওয়ার আলমের বিষয়েও একই ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। টাঙ্গাইলের এসপি মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী। তাকে সুবিধাবাদী কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন। কিশোরগঞ্জের এসপি ড. এসএম ফরহাদ হোসেনকে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত ও আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী সুবিধাভোগী অফিসার বলে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তার বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, তিনি সুবিধাবাদী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। গোপালগঞ্জের এসপি মো. হাবীবুল্লাহর বিষয়ে বলা হয়েছে, ২৭তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা জামায়াতপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত। রাজবাড়ীর এসপি মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদকে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত।
কুমিল্লার এসপি আনিছুজ্জামানকে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। এসপি আনিসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট পতনের পর আমি পদোন্নতি পেয়েছি। তবে পুলিশ সদস্যদের যেভাবে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক না। এ ধরনের ট্যাগ আইনের সঠিক প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।’ যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, আনিসুজ্জামান এসপি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ২০১৮ সালে। কুমিল্লার এসপি হওয়ার আগে তিনি রাজশাহী ও ঢাকার এসপি ছিলেন। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও তিনি।
ফেনীর এসপি শফিকুল ইসলাম বিএনপিপন্থি, আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত ও পদোন্নতিপ্রাপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাঙামাটির এসপি মুহম্মদ আব্দুর রকিব, চাঁদপুরের এসপি রবিউল ইসলাম এবং লক্ষ্মীপুরের এসপি আবু তারেকের (আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত উল্লেখ করা হয়েছে) বিষয়েও একই ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। তবে আদর্শগতভাবে তারা জামায়াতপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়। কক্সবাজারের এসপি এএনএম সাজেদুর রহমানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি একজন বিএনপিপন্থি অফিসার। ২৭তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। বান্দারবানের এসপি আব্দুর রহমান এবং রাঙামাটির এসপি মুহম্মদ আব্দুর রকিবের বিষয়েও একই ধরনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা।
পুলিশের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে জামায়াতপন্থি, আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন-পাবনার আনোয়ার জাহিদ, রংপুরের মারুফাত হুসাইন, নোয়াখালীর টিএম মোশাররফ হোসেন এবং পঞ্চগড়ের রবিউল ইসলাম। যেসব এসপির বিষয়ে জামায়াতপন্থি, আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন-নাটোরের মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব, জয়পুরহাটের মিনা মাহমুদা, যশোরের সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, বাগেরহাটের মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, নড়াইলের আল মামুন শিকদার, মৌলভীবাজারের মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, নেত্রকোনার তরিকুল ইসলাম, শেরপুরের কামরুল ইসলাম এবং নীলফামারীর শেখ জাহিদুল ইসলাম। লালমনিরহাটের এসপি আসাদুজ্জামানকে জামায়াতপন্থি উল্লেখ করা হলেও বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত। আওয়ামী লীগ আমলে তার পদোন্নতি হয়েছিল। গাইবান্ধার এসপি জসিম উদ্দিনকে জামায়াতপন্থি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি সুবিধাবাদী, আওয়ামী লীগ আমলে আংশিক সুবিধাভোগী এবং আংশিক পদোন্নতিপ্রাপ্ত।
গোপনীয় প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে মধ্যপন্থি (আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত, সুবিধাবাদী ও আংশিক সুবিধাভোগী) উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌতম কুমার বিশ্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহ মো. আব্দুর রব, ঝিনাইদহের মাহফুজ আফজাল, চুয়াডাঙ্গার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, ভোলার শহিদুল্লাহ কাওছার, পটুয়াখালীর আবু ইউসুফ, বরগুনার কুদরত-ই-খুদা এবং দিনাজপুরের জেদান আল মুসা। প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে আওয়ামীপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন সাতক্ষীরার আরেফিন জুয়েল, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন, শরীয়তপুরের রওনক জাহান, মেহেরপুরের উজ্জল কুমার রায় এবং সুনামগঞ্জের আবু বাসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) পখান্দকার নজমুল হাসান বলেন, ‘জেলায় কর্মরত এসপিদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর কড়া নজর রাখছে। তাদের বিষয়ে নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সার্বিক বিষয় মূল্যায়ন করে ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় নতুন এসপি দেওয়া হয়েছে। চলমান কাজের অংশ হিসাবে পর্যায়ক্রমে আরও বেশ কয়েকটি জেলায় নতুন এসপি দেওয়া হতে পারে। তথ্যসূত্র : যুগান্তর

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

আবু সাউদ মাসুদ

হ্যালো আমি আবু সাউদ মাসুদ। সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি।

চিহ্নিত হচ্ছে এসপিদের রাজনৈতিক পরিচয়

নারায়ণগঞ্জের এসপি আওয়ামীপন্থি ও সুবিধাভোগী

আপডেট সময় এক মিনিট আগে

পুলিশ সুপারদের (এসপি) রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে খোদ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদন আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। এর ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এ শীর্ষ পদে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পদায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো এসপি পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি অংশ কর্মরত। এছাড়া জামায়াতপন্থি এসপিদের সংখ্যাও কম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের ৬৪ জেলার এসপিদের মধ্যে বিএনপিপন্থি ১৬, জামায়তপন্থি ৩২ এবং আওয়ামী ও মধ্যমপন্থি হিসাবে ৮ জন করে কর্মরত ছিলেন ১৬ জন।
এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত নয় জেলার এসপি বদল করা হয়েছে। এগুলো হলো-সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, হবিগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, মাগুরা, মাদারীপুর ও খাগড়াছড়ি। তবে দুইজন বিএনপিপন্থি না হওয়ায় এ পদায়ন নিয়ে কিছুটা ক্ষোভও রয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরে। যদিও পুলিশের মধ্যে পেশাদার হিসাবে পরিচিত কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা মনে করেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ বাহিনীকে সত্যিকারার্থে দলমতনিরপেক্ষ শক্তিশালী পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। যদি কোনো সরকার এমন চিন্তা থেকে কঠিন কাজটা শুরু না করে, তাহলে পুলিশের পেশাদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোনো লাভ নেই। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজিপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি তো একটি দল করি। এক অর্থে সরকারের অংশ। তাই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এ ধরনের তালিকা করা বা তালিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু ঠিক হচ্ছে-বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে মতামত দেব। আমি মিডিয়ায় সব কথা বলতে পারব না। বিষয়টা আপনারা বুঝে নিন।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। যেভাবে দলীয় ট্যাগ দিয়ে তালিকা করা হচ্ছে, সেটি মোটেও ঠিক নয়। পদায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা ও সততা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন যেভাবে তালিকা বা পদায়ন করা হচ্ছে, সেটি তো প্রভাবিত মতামত।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এসপিদের আমলনামা এরই মধ্যে সংগ্রহ করেছে সরকার। তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক আদর্শও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে করা ওই প্রতিবেদনটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের একটি কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা জেলার এসপি মিজানুর রহমান আওয়ামী লীগ আমলে এসপি পদে পদোন্নতি পান। গত নভেম্বরে তিনি ঢাকা জেলায় যোগদান করেন। মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি পেলেও ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং ছিল না। ট্রেনিং সেন্টারে কাজ করেছি।
নারায়ণগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামীপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। ২৫তম বিসিএস কর্মকর্তা উখিয়া সার্কেলে এএসপি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র‌্যাব ও পিবিআইতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এবং সর্বশেষ পঞ্চগড় জেলা পুলিশের এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দীনের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী লীগের আংশিক সুবিধাভোগী। পদোন্নতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলে। গাজীপুরে যোগদানের আগে বরিশালের পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল ফারুকের বিষয়ে গোপনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হলেও আওয়ামী আমলের আংশিক সুবিধাভোগী। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন। আব্দুল্লাহ আল ফারুক যুগান্তরকে বলেন, আমি পদোন্নতি পেয়েছি ২০২০ সালে। আওয়ামী লীগের আমলে ভালো কোনো পোস্টিং পাইনি। চার বছর ছিলাম ট্রেনিং সেন্টারে।
মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলমের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে আংশিক সুবিধাভোগী জামায়াতপন্থি অফিসার। পদোন্নতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলেই। মানিকগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ সারওয়ার আলমের বিষয়েও একই ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। টাঙ্গাইলের এসপি মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী। তাকে সুবিধাবাদী কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন। কিশোরগঞ্জের এসপি ড. এসএম ফরহাদ হোসেনকে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত ও আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী সুবিধাভোগী অফিসার বলে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তার বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, তিনি সুবিধাবাদী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। গোপালগঞ্জের এসপি মো. হাবীবুল্লাহর বিষয়ে বলা হয়েছে, ২৭তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা জামায়াতপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত। রাজবাড়ীর এসপি মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদকে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত।
কুমিল্লার এসপি আনিছুজ্জামানকে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। এসপি আনিসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট পতনের পর আমি পদোন্নতি পেয়েছি। তবে পুলিশ সদস্যদের যেভাবে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক না। এ ধরনের ট্যাগ আইনের সঠিক প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।’ যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, আনিসুজ্জামান এসপি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ২০১৮ সালে। কুমিল্লার এসপি হওয়ার আগে তিনি রাজশাহী ও ঢাকার এসপি ছিলেন। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও তিনি।
ফেনীর এসপি শফিকুল ইসলাম বিএনপিপন্থি, আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত ও পদোন্নতিপ্রাপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাঙামাটির এসপি মুহম্মদ আব্দুর রকিব, চাঁদপুরের এসপি রবিউল ইসলাম এবং লক্ষ্মীপুরের এসপি আবু তারেকের (আংশিক পদোন্নতিবঞ্চিত উল্লেখ করা হয়েছে) বিষয়েও একই ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। তবে আদর্শগতভাবে তারা জামায়াতপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়। কক্সবাজারের এসপি এএনএম সাজেদুর রহমানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি একজন বিএনপিপন্থি অফিসার। ২৭তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। বান্দারবানের এসপি আব্দুর রহমান এবং রাঙামাটির এসপি মুহম্মদ আব্দুর রকিবের বিষয়েও একই ধরনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা।
পুলিশের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে জামায়াতপন্থি, আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন-পাবনার আনোয়ার জাহিদ, রংপুরের মারুফাত হুসাইন, নোয়াখালীর টিএম মোশাররফ হোসেন এবং পঞ্চগড়ের রবিউল ইসলাম। যেসব এসপির বিষয়ে জামায়াতপন্থি, আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন-নাটোরের মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব, জয়পুরহাটের মিনা মাহমুদা, যশোরের সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, বাগেরহাটের মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, নড়াইলের আল মামুন শিকদার, মৌলভীবাজারের মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, নেত্রকোনার তরিকুল ইসলাম, শেরপুরের কামরুল ইসলাম এবং নীলফামারীর শেখ জাহিদুল ইসলাম। লালমনিরহাটের এসপি আসাদুজ্জামানকে জামায়াতপন্থি উল্লেখ করা হলেও বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত। আওয়ামী লীগ আমলে তার পদোন্নতি হয়েছিল। গাইবান্ধার এসপি জসিম উদ্দিনকে জামায়াতপন্থি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি সুবিধাবাদী, আওয়ামী লীগ আমলে আংশিক সুবিধাভোগী এবং আংশিক পদোন্নতিপ্রাপ্ত।
গোপনীয় প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে মধ্যপন্থি (আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত, সুবিধাবাদী ও আংশিক সুবিধাভোগী) উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌতম কুমার বিশ্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহ মো. আব্দুর রব, ঝিনাইদহের মাহফুজ আফজাল, চুয়াডাঙ্গার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, ভোলার শহিদুল্লাহ কাওছার, পটুয়াখালীর আবু ইউসুফ, বরগুনার কুদরত-ই-খুদা এবং দিনাজপুরের জেদান আল মুসা। প্রতিবেদনে যেসব এসপিকে আওয়ামীপন্থি, আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন সাতক্ষীরার আরেফিন জুয়েল, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন, শরীয়তপুরের রওনক জাহান, মেহেরপুরের উজ্জল কুমার রায় এবং সুনামগঞ্জের আবু বাসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) পখান্দকার নজমুল হাসান বলেন, ‘জেলায় কর্মরত এসপিদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর কড়া নজর রাখছে। তাদের বিষয়ে নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সার্বিক বিষয় মূল্যায়ন করে ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় নতুন এসপি দেওয়া হয়েছে। চলমান কাজের অংশ হিসাবে পর্যায়ক্রমে আরও বেশ কয়েকটি জেলায় নতুন এসপি দেওয়া হতে পারে। তথ্যসূত্র : যুগান্তর