ঢাকা , শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বড় ঝুঁকিতে শিশুস্বাস্থ্য

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে
  • ০ বার পড়া হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার এক নিরিবিলি শান্ত গ্রাম। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে নেমে আসে অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকার যেন একটু আগেই নেমে আসে সাত বছরের সাদিয়ার চোখে। কয়েক মাস ধরে মেয়েটি বারবার একই কথা বলছে—‘মা, কিছু ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না’।
এই ছোট্ট বাক্যটাই তার মা শিউলি বেগমের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। চেপে ধরেছে দুশ্চিন্তা-উদ্বেগ।
শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে না পেরে রোববার (১৯ এপ্রিল) মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে ছুটে আসেন শিউলি বেগম। সেখানে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেয়েকে নিয়ে।
সেখানেই কথা হয় শিউলির সঙ্গে। কথার ফাঁকে ফাঁকেই বেরিয়ে আসে তার উদ্বেগ-অসহায়ত্ব। তিনি জানান, আগে স্থানীয় স্কুলে নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। সাদিয়াও সেই ক্যাম্পেইনের অংশ ছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে আর কেউ আসে না, কোনো খবরও নেই।
শিউলি বেগমের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, “আগে স্কুলে নিয়ে যেত, লাল ক্যাপসুল খাওয়াত। এখন আর কেউ আসে নাৃ সন্ধ্যা হলেই ও বলে ‘মা, কিছু ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন খুব ভয় লাগে।”
একই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দিনমজুর রফিকুল ইসলামের পরিবারেও। তার নয় বছরের ছেলে রাব্বি দুর্বলতা, পেটব্যথা ও অরুচিতে ভোগে।
রফিকুল বলছিলেন, “বছরে দুইবার ট্যাবলেট দিত স্কুলে। এখন বন্ধ। ডাক্তার বলছে কৃমি হতে পারে।’
এই দুই পরিবারের অভিজ্ঞতা এখন বড় এক বাস্তবতার সাক্ষী। প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি থেমে যাওয়ায় সাদিয়া ও রাব্বির মতো অসংখ্য শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে।
অচল অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি)
স্বাস্থ্য খাতের বড় বড় কর্মসূচি কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে চালানো যায় না, এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি)। এই পরিকল্পনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কীভাবে অর্থ খরচ হবে, কোথায় কী সরঞ্জাম যাবে, কতজন জনবল কাজ করবে, কখন মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং কীভাবে তদারকি ও রিপোর্টিং হবে।
“ওপি অচল মানে শুধু একটি ফাইল আটকে থাকা নয়; এটি পুরো সিস্টেমের রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কার্যক্রম থেমে যায়। ফলে যে প্রতিরোধব্যবস্থা একসময় নিয়মিতভাবে কোটি কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিত, সেটি এখন ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর”—মনজুন নাহার, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ
কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রোগ্রামসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে এই অপারেশনাল কাঠামোই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন, ক্রয় প্রক্রিয়া, লজিস্টিকস সরবরাহ, পরিবহন, মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ সবকিছুতেই স্থবিরতা তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাগজে প্রোগ্রাম আছে, কিন্তু চালানোর ‘মেকানিজম’ নেই। ব্যাংকে টাকা থাকলেও তুলতে পারছি না। এই অবস্থায় ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও ফাইন্যান্সিয়াল কোড সক্রিয় না থাকায় সেই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কেন্দ্র থেকে পরিকল্পনা থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আগে একটি ক্যাম্পেইন চালাতে যে প্রস্তুতি দরকার হতো; যেমন ওষুধ সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, স্কুল ও কমিউনিটি সমন্বয়, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ; এসবই এখন থমকে আছে। অনেক জায়গায় সহায়ক জনবল না থাকায় ন্যূনতম কার্যক্রমও চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
মঞ্জুরুল আলম নামে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের কাছে তালিকা আছে, পরিকল্পনা আছে, কিন্তু মাঠে নামার মতো কোনো লজিস্টিকস নেই। গাড়ি নেই, ভাতা নেই, এমনকি কখনো কখনো অফিস খরচ চালানোও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ভাঙনের ইঙ্গিত। কারণ, অপারেশনাল প্ল্যান অচল হয়ে গেলে পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই কার্যত ‘স্টপ মোডে’ চলে যায়। যেখানে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।
এই ভাঙনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে দুটি দীর্ঘদিনের সফল কর্মসূচিতে। তাদের মতে, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি—দুই ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কর্মসূচি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা ওষুধের ঘাটতি প্রধান সমস্যা নয়; বরং সেই কর্মসূচিকে মাঠে নামানোর প্রশাসনিক ও কার্যকরী কাঠামোই অনুপস্থিত।
“কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ খুব দ্রুত ফিরে আসে এবং শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে”—ডা. মুনির হোসেন, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ
জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মনজুন নাহার বলছিলেন, ‘ওপি অচল মানে শুধু একটি ফাইল আটকে থাকা নয়; এটি পুরো সিস্টেমের রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কার্যক্রম থেমে যায়। ফলে যে প্রতিরোধব্যবস্থা একসময় নিয়মিতভাবে কোটি কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিত, সেটি এখন ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।’
কর্মসূচির স্থবিরতায় দুর্বল হয়ে পড়েছে সুরক্ষা বলয়
দেশজুড়ে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-এ প্লাস কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে পরিচালিত না হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে। যেখানে বছরে দুই দফা এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা, সেখানে গত দুই বছরে তা সীমাবদ্ধ থেকেছে মাত্র দুবারে। ফলে শিশুদের পুষ্টি ও দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষায় যে প্রতিরোধব্যবস্থা ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) অধীনে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত চলছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এই কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ায় নতুন করে ক্যাপসুল সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে যে ক্যাম্পেইনটি করা হয়, সেটিও আগের মজুতের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে একটি দফা সম্পন্ন হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে এ ধরনের সফল কর্মসূচির সুফল দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে, যখন অপুষ্টিজনিত রাতকানা ছিল একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৭৩ সালে ‘জাতীয় রাতকানা প্রতিরোধ কার্যক্রম’ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ১৯৯৫ সালে সম্প্রসারিত হয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়, যাতে করে সারাদেশের শিশুদের সহজে এর আওতায় আনা যায়।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি ছয় মাস পরপর নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেওয়া হতো। এর মধ্যে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সীদের জন্য নীল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সীদের জন্য লাল ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছিল।
বছরে দুইবার করে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি শিশুকে কভারেজ দেওয়া হতো। স্কুলভিত্তিক এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচালিত এই কার্যক্রমগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুরাও নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও কৃমিনাশক ওষুধ পেত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাবাহিক কভারেজই ছিল বাংলাদেশের বড় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কারণ, ভিটামিন এ-এর ঘাটতি ও কৃমি সংক্রমণ দুটিই এমন সমস্যা, যা ব্যক্তিগত চিকিৎসার ওপর ছেড়ে দিলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; বরং জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গণকর্মসূচির মাধ্যমেই এগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
জাতীয় পুষ্টি সেবার সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা বলেন, “অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় নিয়মিত ক্যাম্পেইন চালানো যায়নি। ২০২৫ সালের কর্মসূচির জন্য ব্যবহৃত ক্যাপসুল আগেই সংগ্রহ করা ছিল, আর পরিচালন ব্যয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নিজস্বভাবে সামলাতে হয়েছে।”
একইভাবে, জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও দীর্ঘদিন ধরে শিশুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছিল। এই কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণের মাধ্যমে অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং শারীরিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা কমানো সম্ভব হয়েছিল। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে দুই দফায় প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হতো। স্কুলগামী শিশুদের পাশাপাশি প্রান্তিক ও পথশিশুরাও এই সুবিধা পেত।
কিন্তু বর্তমানে এই কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির হয়ে পড়ায় শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ পুনরায় বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃমি সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা। ফলে এই কর্মসূচির ব্যাহত হওয়া সরাসরি একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনির হোসেন বলেন, ‘কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ খুব দ্রুত ফিরে আসে এবং শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে।’
রোগ পুনরুত্থানের আশঙ্কা
প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে ভাটা পড়লে তার প্রথম লক্ষণ দেখা যায় রোগের পুনরুত্থানের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় সংক্রামক রোগের প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সচেতনতা, ওষুধ বিতরণ এবং নিয়মিত ফলোআপ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ায় রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হচ্ছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রোগ যখন চোখে পড়ে, তখন অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। প্রতিরোধের কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘এই দুই কর্মসূচি ছিল শিশুস্বাস্থ্যের ফ্রন্টলাইন ডিফেন্স। এগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে রোগ হওয়ার আগের প্রতিরোধ স্তরটাই ভেঙে যাওয়া।’
“পরিস্থিতি ভালো না। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে রাতকানা আবার বাড়তে পারে। একইভাবে কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ফিরে আসবে। অভিভাবকদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তানদের ওষুধ খাওয়ানো জরুরি”—ডা. লাভলী ইয়াসমিন, শিশু বিশেষজ্ঞ
তিনি ব্যাখ্যা করেন, যখন এই ধরনের গণকর্মসূচি নিয়মিত চালু থাকে, তখন পুরো কমিউনিটিতে একটি ‘প্রোটেকটিভ কভারেজ’ তৈরি হয়। ফলে সংক্রমণ বা পুষ্টিঘাটতি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও একই ইঙ্গিত দেয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্যে, আগে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ক্যাম্পেইন চালানো হতো, যার ফলে অভিভাবকরাও সচেতন ছিলেন এবং শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। এখন সেই কাঠামো ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবারই জানেন না কবে, কোথায় বা আদৌ কোনো কর্মসূচি হবে কি না।
ফলে যে সুরক্ষা বলয় একসময় নিয়মিতভাবে শিশুদের ঘিরে রাখত, সেটি এখন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অতীতের অর্জন যেমন অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব কমানো বা কৃমি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির শক্তি হলো ধারাবাহিকতা। একবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে, অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
যে অর্জন হারানোর ঝুঁকিতে
১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া ভিটামিন এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব, বিশেষ করে রাতকানা প্রতিরোধ করা। সে সময় দেশে শিশুদের মধ্যে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি ছিল ব্যাপক, এবং এর ফলে হাজার হাজার শিশু দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ত। ধীরে ধীরে এই কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা হয়। স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বাড়ি বাড়ি প্রচারণার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ নিশ্চিত করা হয়।
এর ফলাফল ছিল দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রয়াসে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নেমে আসে। একসময় গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ সমস্যা হয়ে থাকা রাতকানা এখন বিরল হয়ে গেছে। এই অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ প্রশংসা পেয়েছে এবং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অন্যদিকে, কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২৭ বছর আগে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার সময় দেশের শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। এটি ছিল শিশুস্বাস্থ্যের একটি বড় কিন্তু অনেকটাই ‘অদৃশ্য’ সমস্যা। যার প্রভাব পড়ত পুষ্টি, শারীরিক বৃদ্ধি, রক্তস্বল্পতা এবং শিক্ষাগত সক্ষমতার ওপর।
জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহের মাধ্যমে বছরে দুইবার করে ব্যাপক পরিসরে কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণ করা হতো। স্কুলভিত্তিক এই কর্মসূচির কারণে খুব কম খরচে বিপুলসংখ্যক শিশুকে কভারেজের আওতায় আনা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে ২০১৯-২০ সালের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের হার নেমে আসে প্রায় ৮ শতাংশে। অর্থাৎ, দুই দশকেরও কম সময়ে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ তখন সয়েল-ট্রান্সমিটেড হেলমিনথোসিস নির্মূলের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই দুই কর্মসূচি বন্ধ মানে শুধু দুটি প্রোগ্রাম বন্ধ নয়; একটি প্রজন্মের সুরক্ষা বলয় ভেঙে যাওয়া। আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, সেখান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
তার মতে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অর্জন ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বন্ধ হলে সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসে, এবং তখন তা নিয়ন্ত্রণ করতে আরও বেশি সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়।
যা নিয়ে শঙ্কা
প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়লে তার প্রভাব একদিনে দৃশ্যমান হয় না, বরং ধীরে ধীরে, নীরবে জমতে থাকে। ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ার পর এখন যে ঝুঁকিগুলো সামনে আসছে, সেগুলো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন নয়; বরং অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই তারা এই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো রাতকানা এবং দৃষ্টিহীনতা। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি হলে প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয় রাতকানা রোগ, অন্ধকারে বা কম আলোতে ঠিকমতো দেখতে না পারা। দীর্ঘদিন এই ঘাটতি অবহেলায় থাকলে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। একসময় গ্রামীণ বাংলাদেশে এই সমস্যা ব্যাপক ছিল, যা দীর্ঘদিনের ক্যাম্পেইনের ফলে প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নেমে এসেছিল। এখন সেই অর্জন আবার ঝুঁকিতে পড়ছে।
অন্যদিকে, কৃমি সংক্রমণের পুনরুত্থান একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলভিত্তিক কভারেজ বন্ধ থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কমিউনিটিতে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কৃমির ডিম মাটি, পানি ও অপরিষ্কার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে; ফলে একটি শিশুর সংক্রমণ পুরো কমিউনিটিতে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে।
কৃমি সংক্রমণের সরাসরি প্রভাব পড়ে পুষ্টির ওপর। কৃমি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়, যার ফলে শিশুদের ওজন না বাড়া, দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) এবং বারবার অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এটি শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। আক্রান্ত শিশুদের মনোযোগ কমে যায়, ক্লাসে উপস্থিতি কমে এবং শেখার সক্ষমতা ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি প্রজন্মের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যাগুলো কেবল স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর। শৈশবে পুষ্টিঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস করে এবং দারিদ্র্যের চক্রকে দীর্ঘায়িত করে।
৪ কোটির বেশি শিশু ঝুঁকিতে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে স্কুলভিত্তিক জাতীয় কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৪ কোটির বেশি শিশু এখন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। আগে এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর দুই দফায় প্রায় ৪ কোটি শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো—অর্থাৎ বছরে প্রায় ৮ কোটি ডোজ ওষুধের প্রয়োজন হতো।
কর্মকর্তারা বলছেন, ওষুধের বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া যেত। কিন্তু কর্মসূচি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল খরচ- যেমন পরিবহন, প্রশিক্ষণ, বিতরণব্যবস্থা, তদারকি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো কার্যক্রম থেমে গেছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘খুব অল্প খরচে দেশের কোটি কোটি শিশুকে সুরক্ষায় রাখা যেত। এখন সেই সুরক্ষা বলয়টাই নেই।’
রাজধানীর আশকোনা ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘গত দুই বছর নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক শিশুই এখন পেটব্যথা, অরুচি বা দুর্বলতা নিয়ে আসছে, যেগুলো কৃমির লক্ষণ হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ঢাকার উত্তরা জাহানারা ক্লিনিকের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো না। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে রাতকানা আবার বাড়তে পারে। একইভাবে কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ফিরে আসবে। অভিভাবকদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তানদের ওষুধ খাওয়ানো জরুরি।’
আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একবার এই চেইন ভেঙে গেলে খুব দ্রুত আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি।’
পদ্ধতিগত সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থবিরতা কোনো একক কর্মসূচির সমস্যা নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের অংশ। মাঠপর্যায়ের সার্ভেইল্যান্স দুর্বল হয়ে পড়েছে, সহায়ক জনবল নিষ্ক্রিয় বা ছাঁটাই হয়েছে, লজিস্টিকস ও ক্রয় প্রক্রিয়া থেমে গেছে এবং ডাটা সংগ্রহে বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে।
ওপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, মানুষ, অর্থ এবং উপকরণ- এই তিনটা একসঙ্গে না থাকলে জনস্বাস্থ্য চলে না। এখন তিনটি ক্ষেত্রেই সমস্যা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন অবিলম্বে পুনরায় চালু করা, জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ পুনরারম্ভ, অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) সক্রিয় করা, স্কুলভিত্তিক কভারেজ দ্রুত ফিরিয়ে আনা এবং মাঠপর্যায়ের জনবল ও লজিস্টিকস পুনর্বহাল করা। পাশাপাশি উচ্চঝুঁকির জেলাগুলোতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

বড় ঝুঁকিতে শিশুস্বাস্থ্য

আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে

স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার এক নিরিবিলি শান্ত গ্রাম। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে নেমে আসে অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকার যেন একটু আগেই নেমে আসে সাত বছরের সাদিয়ার চোখে। কয়েক মাস ধরে মেয়েটি বারবার একই কথা বলছে—‘মা, কিছু ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না’।
এই ছোট্ট বাক্যটাই তার মা শিউলি বেগমের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। চেপে ধরেছে দুশ্চিন্তা-উদ্বেগ।
শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে না পেরে রোববার (১৯ এপ্রিল) মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে ছুটে আসেন শিউলি বেগম। সেখানে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেয়েকে নিয়ে।
সেখানেই কথা হয় শিউলির সঙ্গে। কথার ফাঁকে ফাঁকেই বেরিয়ে আসে তার উদ্বেগ-অসহায়ত্ব। তিনি জানান, আগে স্থানীয় স্কুলে নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। সাদিয়াও সেই ক্যাম্পেইনের অংশ ছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে আর কেউ আসে না, কোনো খবরও নেই।
শিউলি বেগমের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, “আগে স্কুলে নিয়ে যেত, লাল ক্যাপসুল খাওয়াত। এখন আর কেউ আসে নাৃ সন্ধ্যা হলেই ও বলে ‘মা, কিছু ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন খুব ভয় লাগে।”
একই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দিনমজুর রফিকুল ইসলামের পরিবারেও। তার নয় বছরের ছেলে রাব্বি দুর্বলতা, পেটব্যথা ও অরুচিতে ভোগে।
রফিকুল বলছিলেন, “বছরে দুইবার ট্যাবলেট দিত স্কুলে। এখন বন্ধ। ডাক্তার বলছে কৃমি হতে পারে।’
এই দুই পরিবারের অভিজ্ঞতা এখন বড় এক বাস্তবতার সাক্ষী। প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি থেমে যাওয়ায় সাদিয়া ও রাব্বির মতো অসংখ্য শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে।
অচল অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি)
স্বাস্থ্য খাতের বড় বড় কর্মসূচি কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে চালানো যায় না, এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি)। এই পরিকল্পনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কীভাবে অর্থ খরচ হবে, কোথায় কী সরঞ্জাম যাবে, কতজন জনবল কাজ করবে, কখন মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং কীভাবে তদারকি ও রিপোর্টিং হবে।
“ওপি অচল মানে শুধু একটি ফাইল আটকে থাকা নয়; এটি পুরো সিস্টেমের রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কার্যক্রম থেমে যায়। ফলে যে প্রতিরোধব্যবস্থা একসময় নিয়মিতভাবে কোটি কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিত, সেটি এখন ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর”—মনজুন নাহার, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ
কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রোগ্রামসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে এই অপারেশনাল কাঠামোই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন, ক্রয় প্রক্রিয়া, লজিস্টিকস সরবরাহ, পরিবহন, মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ সবকিছুতেই স্থবিরতা তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাগজে প্রোগ্রাম আছে, কিন্তু চালানোর ‘মেকানিজম’ নেই। ব্যাংকে টাকা থাকলেও তুলতে পারছি না। এই অবস্থায় ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও ফাইন্যান্সিয়াল কোড সক্রিয় না থাকায় সেই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কেন্দ্র থেকে পরিকল্পনা থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আগে একটি ক্যাম্পেইন চালাতে যে প্রস্তুতি দরকার হতো; যেমন ওষুধ সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, স্কুল ও কমিউনিটি সমন্বয়, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ; এসবই এখন থমকে আছে। অনেক জায়গায় সহায়ক জনবল না থাকায় ন্যূনতম কার্যক্রমও চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
মঞ্জুরুল আলম নামে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের কাছে তালিকা আছে, পরিকল্পনা আছে, কিন্তু মাঠে নামার মতো কোনো লজিস্টিকস নেই। গাড়ি নেই, ভাতা নেই, এমনকি কখনো কখনো অফিস খরচ চালানোও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ভাঙনের ইঙ্গিত। কারণ, অপারেশনাল প্ল্যান অচল হয়ে গেলে পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই কার্যত ‘স্টপ মোডে’ চলে যায়। যেখানে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।
এই ভাঙনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে দুটি দীর্ঘদিনের সফল কর্মসূচিতে। তাদের মতে, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি—দুই ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কর্মসূচি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা ওষুধের ঘাটতি প্রধান সমস্যা নয়; বরং সেই কর্মসূচিকে মাঠে নামানোর প্রশাসনিক ও কার্যকরী কাঠামোই অনুপস্থিত।
“কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ খুব দ্রুত ফিরে আসে এবং শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে”—ডা. মুনির হোসেন, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ
জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মনজুন নাহার বলছিলেন, ‘ওপি অচল মানে শুধু একটি ফাইল আটকে থাকা নয়; এটি পুরো সিস্টেমের রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কার্যক্রম থেমে যায়। ফলে যে প্রতিরোধব্যবস্থা একসময় নিয়মিতভাবে কোটি কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিত, সেটি এখন ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।’
কর্মসূচির স্থবিরতায় দুর্বল হয়ে পড়েছে সুরক্ষা বলয়
দেশজুড়ে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-এ প্লাস কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে পরিচালিত না হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে। যেখানে বছরে দুই দফা এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা, সেখানে গত দুই বছরে তা সীমাবদ্ধ থেকেছে মাত্র দুবারে। ফলে শিশুদের পুষ্টি ও দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষায় যে প্রতিরোধব্যবস্থা ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) অধীনে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত চলছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এই কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ায় নতুন করে ক্যাপসুল সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে যে ক্যাম্পেইনটি করা হয়, সেটিও আগের মজুতের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে একটি দফা সম্পন্ন হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে এ ধরনের সফল কর্মসূচির সুফল দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে, যখন অপুষ্টিজনিত রাতকানা ছিল একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৭৩ সালে ‘জাতীয় রাতকানা প্রতিরোধ কার্যক্রম’ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ১৯৯৫ সালে সম্প্রসারিত হয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়, যাতে করে সারাদেশের শিশুদের সহজে এর আওতায় আনা যায়।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি ছয় মাস পরপর নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেওয়া হতো। এর মধ্যে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সীদের জন্য নীল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সীদের জন্য লাল ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছিল।
বছরে দুইবার করে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি শিশুকে কভারেজ দেওয়া হতো। স্কুলভিত্তিক এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচালিত এই কার্যক্রমগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুরাও নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও কৃমিনাশক ওষুধ পেত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাবাহিক কভারেজই ছিল বাংলাদেশের বড় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কারণ, ভিটামিন এ-এর ঘাটতি ও কৃমি সংক্রমণ দুটিই এমন সমস্যা, যা ব্যক্তিগত চিকিৎসার ওপর ছেড়ে দিলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; বরং জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গণকর্মসূচির মাধ্যমেই এগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
জাতীয় পুষ্টি সেবার সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা বলেন, “অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় নিয়মিত ক্যাম্পেইন চালানো যায়নি। ২০২৫ সালের কর্মসূচির জন্য ব্যবহৃত ক্যাপসুল আগেই সংগ্রহ করা ছিল, আর পরিচালন ব্যয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নিজস্বভাবে সামলাতে হয়েছে।”
একইভাবে, জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও দীর্ঘদিন ধরে শিশুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছিল। এই কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণের মাধ্যমে অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং শারীরিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা কমানো সম্ভব হয়েছিল। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে দুই দফায় প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হতো। স্কুলগামী শিশুদের পাশাপাশি প্রান্তিক ও পথশিশুরাও এই সুবিধা পেত।
কিন্তু বর্তমানে এই কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির হয়ে পড়ায় শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ পুনরায় বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃমি সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা। ফলে এই কর্মসূচির ব্যাহত হওয়া সরাসরি একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনির হোসেন বলেন, ‘কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ খুব দ্রুত ফিরে আসে এবং শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে।’
রোগ পুনরুত্থানের আশঙ্কা
প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে ভাটা পড়লে তার প্রথম লক্ষণ দেখা যায় রোগের পুনরুত্থানের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় সংক্রামক রোগের প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সচেতনতা, ওষুধ বিতরণ এবং নিয়মিত ফলোআপ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ায় রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হচ্ছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রোগ যখন চোখে পড়ে, তখন অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। প্রতিরোধের কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘এই দুই কর্মসূচি ছিল শিশুস্বাস্থ্যের ফ্রন্টলাইন ডিফেন্স। এগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে রোগ হওয়ার আগের প্রতিরোধ স্তরটাই ভেঙে যাওয়া।’
“পরিস্থিতি ভালো না। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে রাতকানা আবার বাড়তে পারে। একইভাবে কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ফিরে আসবে। অভিভাবকদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তানদের ওষুধ খাওয়ানো জরুরি”—ডা. লাভলী ইয়াসমিন, শিশু বিশেষজ্ঞ
তিনি ব্যাখ্যা করেন, যখন এই ধরনের গণকর্মসূচি নিয়মিত চালু থাকে, তখন পুরো কমিউনিটিতে একটি ‘প্রোটেকটিভ কভারেজ’ তৈরি হয়। ফলে সংক্রমণ বা পুষ্টিঘাটতি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও একই ইঙ্গিত দেয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্যে, আগে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ক্যাম্পেইন চালানো হতো, যার ফলে অভিভাবকরাও সচেতন ছিলেন এবং শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। এখন সেই কাঠামো ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবারই জানেন না কবে, কোথায় বা আদৌ কোনো কর্মসূচি হবে কি না।
ফলে যে সুরক্ষা বলয় একসময় নিয়মিতভাবে শিশুদের ঘিরে রাখত, সেটি এখন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অতীতের অর্জন যেমন অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব কমানো বা কৃমি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির শক্তি হলো ধারাবাহিকতা। একবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে, অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
যে অর্জন হারানোর ঝুঁকিতে
১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া ভিটামিন এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব, বিশেষ করে রাতকানা প্রতিরোধ করা। সে সময় দেশে শিশুদের মধ্যে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি ছিল ব্যাপক, এবং এর ফলে হাজার হাজার শিশু দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ত। ধীরে ধীরে এই কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা হয়। স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বাড়ি বাড়ি প্রচারণার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ নিশ্চিত করা হয়।
এর ফলাফল ছিল দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রয়াসে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নেমে আসে। একসময় গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ সমস্যা হয়ে থাকা রাতকানা এখন বিরল হয়ে গেছে। এই অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ প্রশংসা পেয়েছে এবং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অন্যদিকে, কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২৭ বছর আগে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার সময় দেশের শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। এটি ছিল শিশুস্বাস্থ্যের একটি বড় কিন্তু অনেকটাই ‘অদৃশ্য’ সমস্যা। যার প্রভাব পড়ত পুষ্টি, শারীরিক বৃদ্ধি, রক্তস্বল্পতা এবং শিক্ষাগত সক্ষমতার ওপর।
জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহের মাধ্যমে বছরে দুইবার করে ব্যাপক পরিসরে কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণ করা হতো। স্কুলভিত্তিক এই কর্মসূচির কারণে খুব কম খরচে বিপুলসংখ্যক শিশুকে কভারেজের আওতায় আনা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে ২০১৯-২০ সালের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের হার নেমে আসে প্রায় ৮ শতাংশে। অর্থাৎ, দুই দশকেরও কম সময়ে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ তখন সয়েল-ট্রান্সমিটেড হেলমিনথোসিস নির্মূলের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই দুই কর্মসূচি বন্ধ মানে শুধু দুটি প্রোগ্রাম বন্ধ নয়; একটি প্রজন্মের সুরক্ষা বলয় ভেঙে যাওয়া। আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, সেখান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
তার মতে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অর্জন ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বন্ধ হলে সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসে, এবং তখন তা নিয়ন্ত্রণ করতে আরও বেশি সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়।
যা নিয়ে শঙ্কা
প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়লে তার প্রভাব একদিনে দৃশ্যমান হয় না, বরং ধীরে ধীরে, নীরবে জমতে থাকে। ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ার পর এখন যে ঝুঁকিগুলো সামনে আসছে, সেগুলো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন নয়; বরং অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই তারা এই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো রাতকানা এবং দৃষ্টিহীনতা। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি হলে প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয় রাতকানা রোগ, অন্ধকারে বা কম আলোতে ঠিকমতো দেখতে না পারা। দীর্ঘদিন এই ঘাটতি অবহেলায় থাকলে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। একসময় গ্রামীণ বাংলাদেশে এই সমস্যা ব্যাপক ছিল, যা দীর্ঘদিনের ক্যাম্পেইনের ফলে প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নেমে এসেছিল। এখন সেই অর্জন আবার ঝুঁকিতে পড়ছে।
অন্যদিকে, কৃমি সংক্রমণের পুনরুত্থান একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলভিত্তিক কভারেজ বন্ধ থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কমিউনিটিতে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কৃমির ডিম মাটি, পানি ও অপরিষ্কার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে; ফলে একটি শিশুর সংক্রমণ পুরো কমিউনিটিতে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে।
কৃমি সংক্রমণের সরাসরি প্রভাব পড়ে পুষ্টির ওপর। কৃমি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়, যার ফলে শিশুদের ওজন না বাড়া, দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) এবং বারবার অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এটি শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। আক্রান্ত শিশুদের মনোযোগ কমে যায়, ক্লাসে উপস্থিতি কমে এবং শেখার সক্ষমতা ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি প্রজন্মের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যাগুলো কেবল স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর। শৈশবে পুষ্টিঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস করে এবং দারিদ্র্যের চক্রকে দীর্ঘায়িত করে।
৪ কোটির বেশি শিশু ঝুঁকিতে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে স্কুলভিত্তিক জাতীয় কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৪ কোটির বেশি শিশু এখন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। আগে এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর দুই দফায় প্রায় ৪ কোটি শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো—অর্থাৎ বছরে প্রায় ৮ কোটি ডোজ ওষুধের প্রয়োজন হতো।
কর্মকর্তারা বলছেন, ওষুধের বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া যেত। কিন্তু কর্মসূচি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল খরচ- যেমন পরিবহন, প্রশিক্ষণ, বিতরণব্যবস্থা, তদারকি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো কার্যক্রম থেমে গেছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘খুব অল্প খরচে দেশের কোটি কোটি শিশুকে সুরক্ষায় রাখা যেত। এখন সেই সুরক্ষা বলয়টাই নেই।’
রাজধানীর আশকোনা ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘গত দুই বছর নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক শিশুই এখন পেটব্যথা, অরুচি বা দুর্বলতা নিয়ে আসছে, যেগুলো কৃমির লক্ষণ হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ঢাকার উত্তরা জাহানারা ক্লিনিকের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো না। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে রাতকানা আবার বাড়তে পারে। একইভাবে কৃমিনাশক কর্মসূচি বন্ধ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ফিরে আসবে। অভিভাবকদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তানদের ওষুধ খাওয়ানো জরুরি।’
আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কৃমি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একবার এই চেইন ভেঙে গেলে খুব দ্রুত আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি।’
পদ্ধতিগত সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থবিরতা কোনো একক কর্মসূচির সমস্যা নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের অংশ। মাঠপর্যায়ের সার্ভেইল্যান্স দুর্বল হয়ে পড়েছে, সহায়ক জনবল নিষ্ক্রিয় বা ছাঁটাই হয়েছে, লজিস্টিকস ও ক্রয় প্রক্রিয়া থেমে গেছে এবং ডাটা সংগ্রহে বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে।
ওপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, মানুষ, অর্থ এবং উপকরণ- এই তিনটা একসঙ্গে না থাকলে জনস্বাস্থ্য চলে না। এখন তিনটি ক্ষেত্রেই সমস্যা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন অবিলম্বে পুনরায় চালু করা, জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ পুনরারম্ভ, অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) সক্রিয় করা, স্কুলভিত্তিক কভারেজ দ্রুত ফিরিয়ে আনা এবং মাঠপর্যায়ের জনবল ও লজিস্টিকস পুনর্বহাল করা। পাশাপাশি উচ্চঝুঁকির জেলাগুলোতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।