ঢাকা , রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংগঠিত হচ্ছে হকাররা

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় ০২:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার
ঘোষণা দিয়ে শহরের কয়েকটি সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালানো হকারদের উচ্ছেদ করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। উচ্ছেদের চারদিনের মাথায় পুনর্বাসনের দাবিতে সংগঠিত হচ্ছেন হকাররা। তাদের ভাষ্য, উচ্ছেদের কারণে তারা হারিয়েছেন জীবিকার উৎস। ফলে তারা আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
হকাররা পুনর্বাসনের দাবিতে নগর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে বসার পাশাপাশি আন্দোলনের দিকে যাবার কথাও ভাবছেন। তবে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বা আশ্বাস দেওয়া হলে এমন কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর ফুটপাতে গত কয়েক বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন কয়েক হাজার হকার। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদাও নেন কিছু ব্যক্তি। তাদের পেছন থেকে মদদ দিয়ে থাকেন রাজনৈতিক নেতারা। ফলে, একাধিকবার ফুটপাত হকারমুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনকে পিছু হটতে হয়। যা সাধারণ নগরবাসীর ফুটপাত দিয়ে চলাচল বাধাগ্রস্ত করে।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শহরের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন সিটি মেয়র ছিলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার এই উদ্যোগকে স্বাগতও জানিয়েছিল নগরবাসী। কয়েকদিন হকারমুক্ত ফুটপাত ছিল। কিন্তু তখন নগরবাসীর বিরুদ্ধে গিয়ে হকারদের পক্ষ নেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। এ নিয়ে পরে ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি চাষাঢ়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে আইভীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। তারপর আর হকারদের উচ্ছেদ করা যায়নি। নগরবাসীও ফুটপাতে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শহরে হকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। এক সময় ফুটপাত দখল করে রাখলেও হকাররা পরে সড়কের উপরও নেমে আসেন। ফলে, মানুষের হাঁটায় বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটায়। যা শহরের যানজট আরও বাড়িয়ে দেয়।
গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি সরকার গঠন করলে শহরকে হকারমুক্ত করার দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। গত ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি দায়িত্ব নিয়ে নগরীকে হকার ও যানজটমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সিটি প্রশাসক সাখাওয়াত ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বসেন। তখন প্রশাসনিকভাবে হকার উচ্ছেদে সহযোগিতার আশ্বাস পান তারা। এ নিয়ে সিটি প্রশাসক স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতাদের নিয়েও বসেন। তারাও হকারমুক্ত ফুটপাত করার দাবিতে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। পরে গত ১৩ এপ্রিল ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতাদের উপস্থিতিতে হকার উচ্ছেদে নামে সিটি কর্পোরেশন। এ অভিযানে বঙ্গবন্ধু সড়ক, শায়েস্তা খাঁ সড়ক, নবাব সিরাজদ্দৌল্লা সড়ক ও নবাব সলিমুল্লাহ সড়কের ফুটপাত হকারমুক্ত করা হয়।
তবে, হকারদের পুনর্বাসনের কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত হয়নি। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা হকারদের পুনর্বাসন করে তাদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও দাবি জানিয়ে আসছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হকাররা।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়ন দলের সভাপতি মিজানুর রহমান রনি বলেন, “হকাররা গরীব মানুষ, এটাই তাদের জীবিকা। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, যেন আমাদের বিষয়ে মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হয়। নাহলে আমাদের সংসারে চুলা জ্বলবে না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে।”
“আমরা কিছুদিন দেখবো। প্রশাসন যদি আমাদের দিকটা বিবেচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয় তাহলে আমরা তাদের কাছে যাবো, আমাদের দাবি জানাবো। প্রয়োজনে আন্দোলনেও নামবে হকাররা।”
এদিকে, একসময় হকারদের নেতৃত্ব দিয়েছেন হকার্স সংগ্রাম পরিষদের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি আসাদুর রহমান আসাদ। মুঠোফোনে এই হকার নেতা বলেন, “যে সরকারই আসুক না কেন, হকারদের নিয়ে তারা খেলতে থাকেন। কথায় কথায় কয়েকদিন পরপরই হকারদের উচ্ছেদ করা হয়। আমরা চেয়েছি, মানুষকে ভোগান্তি না দিয়ে কীভাবে বসা যায়। কিন্তু প্রশাসনও এ বিষয়ে উদ্যোগী হন না। তারা কেবল উচ্ছেদের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। এইটা আসলে কোনোভাবে কাম্য না।”
“বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, প্রশাসক বা মেয়র তাদের কাছে রিকোয়েস্ট- হকারদের একটা সিস্টেমে নিয়ে আসেন, কেবল উচ্ছেদই সমাধান না। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ আমাদের থেকেই কেনাকাটা করেন। আমরা এ নিয়ে কোনো সমাধান না পেলে রাস্তায় নেমে আসবো”, বলেন হকার নেতা আসাদ।
জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি হাফিজুল ইসলামও গতবার হকারদের পুনর্বাসনের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। তিনি এবারও একই দাবি জানিয়ে বলেন, “ নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচলের বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। পুনর্বাসন ছাড়া কাউকেই উচ্ছেদ করাটা অমানবিক। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে দিনের নির্দিষ্ট সময় বা ছুটির দিনে নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় হকারদের বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত বলে মনে করি।”

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

সংগঠিত হচ্ছে হকাররা

আপডেট সময় ০২:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার
ঘোষণা দিয়ে শহরের কয়েকটি সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালানো হকারদের উচ্ছেদ করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। উচ্ছেদের চারদিনের মাথায় পুনর্বাসনের দাবিতে সংগঠিত হচ্ছেন হকাররা। তাদের ভাষ্য, উচ্ছেদের কারণে তারা হারিয়েছেন জীবিকার উৎস। ফলে তারা আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
হকাররা পুনর্বাসনের দাবিতে নগর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে বসার পাশাপাশি আন্দোলনের দিকে যাবার কথাও ভাবছেন। তবে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বা আশ্বাস দেওয়া হলে এমন কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর ফুটপাতে গত কয়েক বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন কয়েক হাজার হকার। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদাও নেন কিছু ব্যক্তি। তাদের পেছন থেকে মদদ দিয়ে থাকেন রাজনৈতিক নেতারা। ফলে, একাধিকবার ফুটপাত হকারমুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনকে পিছু হটতে হয়। যা সাধারণ নগরবাসীর ফুটপাত দিয়ে চলাচল বাধাগ্রস্ত করে।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শহরের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন সিটি মেয়র ছিলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার এই উদ্যোগকে স্বাগতও জানিয়েছিল নগরবাসী। কয়েকদিন হকারমুক্ত ফুটপাত ছিল। কিন্তু তখন নগরবাসীর বিরুদ্ধে গিয়ে হকারদের পক্ষ নেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। এ নিয়ে পরে ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি চাষাঢ়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে আইভীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। তারপর আর হকারদের উচ্ছেদ করা যায়নি। নগরবাসীও ফুটপাতে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শহরে হকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। এক সময় ফুটপাত দখল করে রাখলেও হকাররা পরে সড়কের উপরও নেমে আসেন। ফলে, মানুষের হাঁটায় বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটায়। যা শহরের যানজট আরও বাড়িয়ে দেয়।
গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি সরকার গঠন করলে শহরকে হকারমুক্ত করার দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। গত ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি দায়িত্ব নিয়ে নগরীকে হকার ও যানজটমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সিটি প্রশাসক সাখাওয়াত ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বসেন। তখন প্রশাসনিকভাবে হকার উচ্ছেদে সহযোগিতার আশ্বাস পান তারা। এ নিয়ে সিটি প্রশাসক স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতাদের নিয়েও বসেন। তারাও হকারমুক্ত ফুটপাত করার দাবিতে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। পরে গত ১৩ এপ্রিল ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতাদের উপস্থিতিতে হকার উচ্ছেদে নামে সিটি কর্পোরেশন। এ অভিযানে বঙ্গবন্ধু সড়ক, শায়েস্তা খাঁ সড়ক, নবাব সিরাজদ্দৌল্লা সড়ক ও নবাব সলিমুল্লাহ সড়কের ফুটপাত হকারমুক্ত করা হয়।
তবে, হকারদের পুনর্বাসনের কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত হয়নি। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা হকারদের পুনর্বাসন করে তাদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও দাবি জানিয়ে আসছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হকাররা।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়ন দলের সভাপতি মিজানুর রহমান রনি বলেন, “হকাররা গরীব মানুষ, এটাই তাদের জীবিকা। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, যেন আমাদের বিষয়ে মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হয়। নাহলে আমাদের সংসারে চুলা জ্বলবে না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে।”
“আমরা কিছুদিন দেখবো। প্রশাসন যদি আমাদের দিকটা বিবেচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয় তাহলে আমরা তাদের কাছে যাবো, আমাদের দাবি জানাবো। প্রয়োজনে আন্দোলনেও নামবে হকাররা।”
এদিকে, একসময় হকারদের নেতৃত্ব দিয়েছেন হকার্স সংগ্রাম পরিষদের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি আসাদুর রহমান আসাদ। মুঠোফোনে এই হকার নেতা বলেন, “যে সরকারই আসুক না কেন, হকারদের নিয়ে তারা খেলতে থাকেন। কথায় কথায় কয়েকদিন পরপরই হকারদের উচ্ছেদ করা হয়। আমরা চেয়েছি, মানুষকে ভোগান্তি না দিয়ে কীভাবে বসা যায়। কিন্তু প্রশাসনও এ বিষয়ে উদ্যোগী হন না। তারা কেবল উচ্ছেদের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। এইটা আসলে কোনোভাবে কাম্য না।”
“বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, প্রশাসক বা মেয়র তাদের কাছে রিকোয়েস্ট- হকারদের একটা সিস্টেমে নিয়ে আসেন, কেবল উচ্ছেদই সমাধান না। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ আমাদের থেকেই কেনাকাটা করেন। আমরা এ নিয়ে কোনো সমাধান না পেলে রাস্তায় নেমে আসবো”, বলেন হকার নেতা আসাদ।
জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি হাফিজুল ইসলামও গতবার হকারদের পুনর্বাসনের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। তিনি এবারও একই দাবি জানিয়ে বলেন, “ নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচলের বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। পুনর্বাসন ছাড়া কাউকেই উচ্ছেদ করাটা অমানবিক। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে দিনের নির্দিষ্ট সময় বা ছুটির দিনে নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় হকারদের বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত বলে মনে করি।”