ঢাকা , বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরান কি আসলেই অপরাজেয় এফ-৩৫ ভূপাতিত করেছিল

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় ৬ ঘন্টা আগে
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করেছে। এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, একটি যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে বিমানটি ইরানের আঘাতের শিকার হয়েছিল—ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও একই দাবি করেছে।

যদি এটি সত্য হয়, তবে ওয়াশিংটনের আকাশপথের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এই যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইরানের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলো।

ঘটনাটি সম্পর্কে যা জানা গেল 

গত বৃহস্পতিবার এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেটটি জরুরি অবতরণ করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন।

হকিন্স আরও বলেন, এই ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে বিমানটি কেন বা কোথায় অবতরণ করেছে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। একই দিনে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে তারা একটি মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশনা ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর রোববারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইলট ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আহত হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিমানটি ভূমি থেকে ছোঁড়া গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি সামরিক ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যেখানে তাদের দাবি অনুযায়ী তেহরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি মার্কিন এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটারকে আঘাত করতে দেখা যাচ্ছে।

এফ-৩৫ কী এবং এর বিশেষত্ব কী

এফ-৩৫ হলো মার্কিন এরোস্পেস কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি স্টিলথ স্ট্রাইক ফাইটার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বিমান। এর পুরো নাম ‘এফ-৩৫ লাইটনিং ২’। এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ব্রিটিশ নিরাপত্তা ও ঝুঁকি বিষয়ক উপদেষ্টা জন ফিলিপস বলেন, এফ-৩৫-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রাডার স্যুইটস। রাডার স্যুইটস হলো হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের এমন একটি সমন্বয় যা নির্দিষ্ট হুমকি শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এর রাডার প্রযুক্তি দেশভেদে ভিন্ন হয় যাতে চীন বা রাশিয়ার মতো বিদেশি শত্রুরা এই প্রযুক্তির ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে না পারে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্য এফ-৩৫ তৈরির অংশীদার। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইসরাইলসহ ২০টি দেশ এই বিমান কিনেছে।

এর তিনটি মডেল আছে

এফ-৩৫এ: সবচেয়ে সাধারণ মডেল, যা সাধারণ রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।

এফ-৩৫বি: হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে অবতরণ করতে পারে এবং খুব ছোট রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন করতে পারে।

এফ-৩৫সি এটি সুপারসনিক বিমান (শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন) এবং দূরপাল্লার অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে।

গত সপ্তাহে ইরান কোন মডেলটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে তা জানা যায়নি।

ইরান এটি ভূপাতিত করে থাকলে তা কেন গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন কর্মকর্তারা এখনও নিশ্চিত করেননি যে এফ-৩৫ বিমানটি সত্যিই ইরানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা। বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা যেখানে খুশি উড়ছি। কেউ আমাদের দিকে গুলিও করছে না।’

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও শত্রুপক্ষের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো নিশ্চিত ঘটনা আগে ঘটেনি। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের দাবি সত্য হলে প্রমাণিত হবে যে এফ-৩৫ যুদ্ধে অপরাজেয় নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘এটি তাৎপর্যপূর্ণ হবে কারণ এটি প্রমাণ করবে যে এফ-৩৫-এর মতো বিমানও একটি ঘন ও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা পরিবেশে সুরক্ষিত নয়।’

ইরান যুদ্ধে আর কোন কোন মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়েছে

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে রিপোর্ট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ১২টি ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন হারিয়েছে। এছাড়া গত ১৪ মার্চ সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচটি ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। পহেলা মার্চ কুয়েতের একটি বিমানের সঙ্গে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা ভুলবশত নিজেদের গোলার আঘাতে তিনটি মার্কিন ‘এফ-১৫ই’ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল।

রোববার ইরান দাবি করেছে যে তারা হরমুজ দ্বীপের কাছে তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান প্রতিহত করেছে। তবে সেন্টকম এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন ৮হাজারের বেশি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা হলেও ইরানের হাতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়নি।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

ইরান কি আসলেই অপরাজেয় এফ-৩৫ ভূপাতিত করেছিল

আপডেট সময় ৬ ঘন্টা আগে

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করেছে। এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, একটি যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে বিমানটি ইরানের আঘাতের শিকার হয়েছিল—ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও একই দাবি করেছে।

যদি এটি সত্য হয়, তবে ওয়াশিংটনের আকাশপথের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এই যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইরানের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলো।

ঘটনাটি সম্পর্কে যা জানা গেল 

গত বৃহস্পতিবার এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেটটি জরুরি অবতরণ করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন।

হকিন্স আরও বলেন, এই ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে বিমানটি কেন বা কোথায় অবতরণ করেছে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। একই দিনে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে তারা একটি মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশনা ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর রোববারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইলট ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আহত হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিমানটি ভূমি থেকে ছোঁড়া গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি সামরিক ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যেখানে তাদের দাবি অনুযায়ী তেহরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি মার্কিন এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটারকে আঘাত করতে দেখা যাচ্ছে।

এফ-৩৫ কী এবং এর বিশেষত্ব কী

এফ-৩৫ হলো মার্কিন এরোস্পেস কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি স্টিলথ স্ট্রাইক ফাইটার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বিমান। এর পুরো নাম ‘এফ-৩৫ লাইটনিং ২’। এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ব্রিটিশ নিরাপত্তা ও ঝুঁকি বিষয়ক উপদেষ্টা জন ফিলিপস বলেন, এফ-৩৫-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রাডার স্যুইটস। রাডার স্যুইটস হলো হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের এমন একটি সমন্বয় যা নির্দিষ্ট হুমকি শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এর রাডার প্রযুক্তি দেশভেদে ভিন্ন হয় যাতে চীন বা রাশিয়ার মতো বিদেশি শত্রুরা এই প্রযুক্তির ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে না পারে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্য এফ-৩৫ তৈরির অংশীদার। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইসরাইলসহ ২০টি দেশ এই বিমান কিনেছে।

এর তিনটি মডেল আছে

এফ-৩৫এ: সবচেয়ে সাধারণ মডেল, যা সাধারণ রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।

এফ-৩৫বি: হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে অবতরণ করতে পারে এবং খুব ছোট রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন করতে পারে।

এফ-৩৫সি এটি সুপারসনিক বিমান (শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন) এবং দূরপাল্লার অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে।

গত সপ্তাহে ইরান কোন মডেলটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে তা জানা যায়নি।

ইরান এটি ভূপাতিত করে থাকলে তা কেন গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন কর্মকর্তারা এখনও নিশ্চিত করেননি যে এফ-৩৫ বিমানটি সত্যিই ইরানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা। বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা যেখানে খুশি উড়ছি। কেউ আমাদের দিকে গুলিও করছে না।’

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও শত্রুপক্ষের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো নিশ্চিত ঘটনা আগে ঘটেনি। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের দাবি সত্য হলে প্রমাণিত হবে যে এফ-৩৫ যুদ্ধে অপরাজেয় নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘এটি তাৎপর্যপূর্ণ হবে কারণ এটি প্রমাণ করবে যে এফ-৩৫-এর মতো বিমানও একটি ঘন ও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা পরিবেশে সুরক্ষিত নয়।’

ইরান যুদ্ধে আর কোন কোন মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়েছে

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে রিপোর্ট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ১২টি ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন হারিয়েছে। এছাড়া গত ১৪ মার্চ সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচটি ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। পহেলা মার্চ কুয়েতের একটি বিমানের সঙ্গে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা ভুলবশত নিজেদের গোলার আঘাতে তিনটি মার্কিন ‘এফ-১৫ই’ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল।

রোববার ইরান দাবি করেছে যে তারা হরমুজ দ্বীপের কাছে তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান প্রতিহত করেছে। তবে সেন্টকম এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন ৮হাজারের বেশি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা হলেও ইরানের হাতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়নি।