ঢাকা , সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোনারগাঁয়ের রসালো লিচু বাজারে

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সোজাসাপটা রিপোর্ট
বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ সোনারগাঁ একসময় ছিল বাংলার রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। মুঘল-পূর্ব যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত এই অঞ্চল শিল্প, সংস্কৃতি ও ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী জনপদেই আজও কৃষি ও ফলজ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে সোনারগাঁয়ের বিখ্যাত লিচু।
এবারও মৌসুমের শুরুতেই সোনারগাঁয়ে রসালো আগাম লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। গাছে গাছে ঝুলে থাকা লালচে ফল, চারপাশজুড়ে কৃষকদের ব্যস্ততা এবং পাইকারদের ভিড়ে পুরো এলাকা এখন এক ধরনের মৌসুমি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, উর্বর মাটি এবং আবহাওয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সোনারগাঁয়ের লিচু আগে পাকে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই এই লিচুর চাহিদা থাকে বেশি, আর বাজারে দেখা যায় দামের চাপ। মিষ্টি স্বাদ ও আকারে বড় হওয়ায় এই লিচু দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের মাধ্যমে সোনারগাঁয়ে প্রথম লিচু চাষের সূচনা হয়। পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে আনা এই ফল প্রথমে সীমিত পরিসরে চাষ হলেও ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি পুরো অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত।
এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রধানত পাতি, কদমী ও বোম্বাই (চায়না-৩) জাতের লিচু চাষ হয়। মৌসুমের শুরুতে পাতি লিচু বাজারে আসে, এরপর কদমী এবং শেষে বোম্বাই লিচু। আকারে বড় ও রসালো হওয়ায় বোম্বাই লিচুকে স্থানীয়ভাবে অনেকেই ‘দিলীকা লাড্ডু’ নামে ডাকেন।
বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লিচু। লালচে ফলের এসব দৃশ্য পুরো গ্রামাঞ্চলকে নতুন রঙে সাজিয়েছে। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে চাষিদের কঠোর পরিশ্রম। পাখি ও বাদুড়ের আক্রমণ ঠেকাতে রাত জেগে পাহারা, বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো এবং শব্দ করে তাড়ানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ের ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫টি গ্রাম লিচু চাষের জন্য পরিচিত। গোয়ালদী, হরিষপুর, দুলালপুর, পানাম, খাসনগর, চিলারবাগ, ইছাপাড়া, দত্তপাড়া, হাতকোপা, অজুন্দীসহ বিভিন্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি লিচুবাগান রয়েছে। এসব এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের ভিটাবাড়িতেও লিচু গাছ দেখা যায়।
স্থানীয় চাষিরা জানান, বর্তমানে কদমী, মোজাফফরপুরী, বোম্বাই (চায়না-৩) এলাচি ও পাতি-এই পাঁচ ধরনের লিচুর চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে কদমী লিচুর চাষ সবচেয়ে বেশি। লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক নতুন করে লিচুবাগান গড়ে তুলছেন। একটি বাগান মৌসুমে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানান তারা।
চলতি মৌসুমে বাজারে লিচুর দামও তুলনামূলক বেশি। ১০০ কদমী লিচু ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, বোম্বাই লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পাতি লিচু ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সরবরাহ ও ফলনের ওপর ভিত্তি করে দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
লিচু বিক্রেতা আলাউদ্দিন বলেন, সোনারগাঁয়ের লিচু আকারে বড় ও স্বাদে অনন্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা আগেভাগেই এসে কিনে নিয়ে যান।
কুমিল্লা থেকে আসা দুই বন্ধু আসিফ ও সজিব বলেন, সোনারগাঁয়ের লিচুর ঐতিহ্য আছে বলেই আমরা প্রতি বছর আসি। তবে এবার এলাকায় এখনই বৃষ্টি হচ্ছে, যদি এই বৃষ্টি চলতে থাকে তাহলে কিছু লিচু ফেটে যাওয়া ও পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাইজদিয়া গ্রামের লিচুবাগান মালিক ইকবাল জানান, এ বছর ফলন আগেই কিছুটা কম ছিল। এখন টানা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এতে অনেক লিচু গাছেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহা আলী বলেন, বাজারে চাহিদা ভালো, কিন্তু এখনকার বৃষ্টি যদি কয়েকদিন থাকে তাহলে সরবরাহ কমে যাবে এবং অনেক লিচু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন,সোনারগাঁয়ের লিচু আকারে বড়, রসালো এবং স্বাদে অনেক ভালো। তবে এবার প্রতি হাজার ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় কিছুটা বেশি। তারপরও স্বাদের জন্যই দূর থেকে এসে কিনে নিচ্ছি।
সোনারগাঁ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন,২০২৫-২৬ অর্থবছরে সোনারগাঁয়ে প্রায় ১১০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টির কারণে লিচুর কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ফল ফেটে যাওয়া, পচন ধরা এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বৃষ্টির প্রভাবে লিচু দ্রুত আকারে বড় হয়ে যায় ।
এ অবস্থায় ক্ষতি কমাতে কৃষকদের একটি কীটনাশক ও একটি ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সার্বক্ষণিকভাবে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

সোনারগাঁয়ের রসালো লিচু বাজারে

আপডেট সময় এক ঘন্টা আগে

সোজাসাপটা রিপোর্ট
বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ সোনারগাঁ একসময় ছিল বাংলার রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। মুঘল-পূর্ব যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত এই অঞ্চল শিল্প, সংস্কৃতি ও ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী জনপদেই আজও কৃষি ও ফলজ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে সোনারগাঁয়ের বিখ্যাত লিচু।
এবারও মৌসুমের শুরুতেই সোনারগাঁয়ে রসালো আগাম লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। গাছে গাছে ঝুলে থাকা লালচে ফল, চারপাশজুড়ে কৃষকদের ব্যস্ততা এবং পাইকারদের ভিড়ে পুরো এলাকা এখন এক ধরনের মৌসুমি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, উর্বর মাটি এবং আবহাওয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সোনারগাঁয়ের লিচু আগে পাকে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই এই লিচুর চাহিদা থাকে বেশি, আর বাজারে দেখা যায় দামের চাপ। মিষ্টি স্বাদ ও আকারে বড় হওয়ায় এই লিচু দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের মাধ্যমে সোনারগাঁয়ে প্রথম লিচু চাষের সূচনা হয়। পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে আনা এই ফল প্রথমে সীমিত পরিসরে চাষ হলেও ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি পুরো অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত।
এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রধানত পাতি, কদমী ও বোম্বাই (চায়না-৩) জাতের লিচু চাষ হয়। মৌসুমের শুরুতে পাতি লিচু বাজারে আসে, এরপর কদমী এবং শেষে বোম্বাই লিচু। আকারে বড় ও রসালো হওয়ায় বোম্বাই লিচুকে স্থানীয়ভাবে অনেকেই ‘দিলীকা লাড্ডু’ নামে ডাকেন।
বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লিচু। লালচে ফলের এসব দৃশ্য পুরো গ্রামাঞ্চলকে নতুন রঙে সাজিয়েছে। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে চাষিদের কঠোর পরিশ্রম। পাখি ও বাদুড়ের আক্রমণ ঠেকাতে রাত জেগে পাহারা, বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো এবং শব্দ করে তাড়ানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ের ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫টি গ্রাম লিচু চাষের জন্য পরিচিত। গোয়ালদী, হরিষপুর, দুলালপুর, পানাম, খাসনগর, চিলারবাগ, ইছাপাড়া, দত্তপাড়া, হাতকোপা, অজুন্দীসহ বিভিন্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি লিচুবাগান রয়েছে। এসব এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের ভিটাবাড়িতেও লিচু গাছ দেখা যায়।
স্থানীয় চাষিরা জানান, বর্তমানে কদমী, মোজাফফরপুরী, বোম্বাই (চায়না-৩) এলাচি ও পাতি-এই পাঁচ ধরনের লিচুর চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে কদমী লিচুর চাষ সবচেয়ে বেশি। লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক নতুন করে লিচুবাগান গড়ে তুলছেন। একটি বাগান মৌসুমে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানান তারা।
চলতি মৌসুমে বাজারে লিচুর দামও তুলনামূলক বেশি। ১০০ কদমী লিচু ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, বোম্বাই লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পাতি লিচু ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সরবরাহ ও ফলনের ওপর ভিত্তি করে দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
লিচু বিক্রেতা আলাউদ্দিন বলেন, সোনারগাঁয়ের লিচু আকারে বড় ও স্বাদে অনন্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা আগেভাগেই এসে কিনে নিয়ে যান।
কুমিল্লা থেকে আসা দুই বন্ধু আসিফ ও সজিব বলেন, সোনারগাঁয়ের লিচুর ঐতিহ্য আছে বলেই আমরা প্রতি বছর আসি। তবে এবার এলাকায় এখনই বৃষ্টি হচ্ছে, যদি এই বৃষ্টি চলতে থাকে তাহলে কিছু লিচু ফেটে যাওয়া ও পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাইজদিয়া গ্রামের লিচুবাগান মালিক ইকবাল জানান, এ বছর ফলন আগেই কিছুটা কম ছিল। এখন টানা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এতে অনেক লিচু গাছেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহা আলী বলেন, বাজারে চাহিদা ভালো, কিন্তু এখনকার বৃষ্টি যদি কয়েকদিন থাকে তাহলে সরবরাহ কমে যাবে এবং অনেক লিচু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন,সোনারগাঁয়ের লিচু আকারে বড়, রসালো এবং স্বাদে অনেক ভালো। তবে এবার প্রতি হাজার ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় কিছুটা বেশি। তারপরও স্বাদের জন্যই দূর থেকে এসে কিনে নিচ্ছি।
সোনারগাঁ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন,২০২৫-২৬ অর্থবছরে সোনারগাঁয়ে প্রায় ১১০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টির কারণে লিচুর কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ফল ফেটে যাওয়া, পচন ধরা এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বৃষ্টির প্রভাবে লিচু দ্রুত আকারে বড় হয়ে যায় ।
এ অবস্থায় ক্ষতি কমাতে কৃষকদের একটি কীটনাশক ও একটি ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সার্বক্ষণিকভাবে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।